
আমেরিকার সঙ্গে চলতে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তান মারফত কড়া বার্তা পাঠাল ইরান। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স’ জানিয়েছে, বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাঁর পাকিস্তান সফরে ওয়াশিংটনের জন্য তেহরানের ‘রেড লাইন’ বা শেষ সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এই সীমা মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে— "পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালী"।
তবে রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই বার্তা চালাচালি মানেই ইরান-আমেরিকা আলোচনা শুরু হওয়া নয়। বরং আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং কোন কোন বিষয়ে ইরান আপস করবে না, তা স্পষ্ট করতেই এই পদক্ষেপ। বার্তার বিষয়বস্তু নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও, ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা কিন্তু থেমে নেই। আব্বাস আরাঘচি বর্তমানে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে রয়েছেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। এর আগে সপ্তাহান্তে তিনি পাকিস্তান ও ওমানে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা সেরেছেন।
রাশিয়ায় পৌঁছে আরাঘচি ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা IRNA-কে জানান, পাকিস্তানে তাঁর আলোচনার মূল বিষয় ছিল, কী কী শর্তে "ইরান-আমেরিকা আলোচনা আবার শুরু হতে পারে"।
এই পদক্ষেপ এমন একটা সময়ে নেওয়া হল, যখন ওয়াশিংটন আলোচনার বিষয়ে কড়া অবস্থান বজায় রেখেছে। রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বিশেষ দূতদের পাকিস্তান সফর বাতিলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরানের নেতারা যদি আলোচনা করতে চান, "তাঁরা ফোন করতে পারেন"। একইসঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই সংঘাত "খুব শীঘ্রই শেষ হতে পারে"।
এই ‘রেড লাইন’ স্পষ্ট করার পরেই তেহরান পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি "নতুন প্রস্তাব" জমা দিয়েছে। Axios-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে "হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ শেষ করার" একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
হোয়াইট হাউস এর আগে দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের ইসলামাবাদ সফর বাতিল করে। মনে করা হয়, "তেহরানের আগের প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট" হয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে আমেরিকার একটি দাবি— ইরানকে কমপক্ষে দশ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং তাদের বর্তমান পারমাণবিক ভান্ডার বিদেশে সরিয়ে ফেলতে হবে।
পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো নতুন প্রস্তাবে একটি "দুই-পর্যায়ের পরিকল্পনা"-র কথা বলা হয়েছে, যেখানে সামুদ্রিক সংকট এবং মার্কিন নৌ-অবরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবে হয় "দীর্ঘমেয়াদী" যুদ্ধবিরতি বাড়ানো বা "স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার" কথা বলা হয়েছে।
এই ব্যবস্থা অনুযায়ী, পারমাণবিক আলোচনা "কেবলমাত্র পরবর্তী পর্যায়ে শুরু হবে", বিশেষ করে যখন সামুদ্রিক পথ পরিষ্কার হবে এবং অবরোধ তুলে নেওয়া হবে। Axios জানাচ্ছে, হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে "প্রস্তাবটি পেয়েছে", কিন্তু "আমেরিকা এটি বিবেচনা করতে ইচ্ছুক কিনা তা স্পষ্ট নয়"।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও আলোচক দল পাঠাতে তাঁর অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেছেন, "আমরা টেলিফোনেই ভালোভাবে কাজটা করতে পারি। ইরানিরা চাইলে আমাদের ফোন করতে পারে।"
তেহরান হরমুজ প্রণালীর উপর তার কৌশলগত অবস্থানকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে চলেছে, অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলিতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে "জিনিসের দাম বাড়ছে এবং বাজারে অস্থিরতা" তৈরি হচ্ছে।
ইরানের অবস্থান হল, ওয়াশিংটনকে প্রথমে "বাধা" দূর করতে হবে, বিশেষ করে নৌ-অবরোধ। অন্যদিকে, আমেরিকা এখনও ইরানের "পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা", ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর উপর জোর দিচ্ছে। যা দুই দেশের মধ্যে "বিরাট ব্যবধান" তুলে ধরে।