
সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট করার অভিযোগে ২৩ বছরের এক ইরানি তরুণীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর এই খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
ওই তরুণীর নাম নাজমেহ আমিনি। তিনি অ্যাকাউন্টিংয়ের ছাত্রী। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরের ভাকিলাবাদ জেলে বন্দি রয়েছেন তিনি। দুটি আলাদা মামলায় আদালত তাঁকে সাজা শুনিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এবং ইরানি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, নবীকে অপমানের অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো অন্য একটি মামলায় তাঁকে ১২ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ইরানে মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজার ব্যবহার নিয়ে এমনিতেই উদ্বেগ বাড়ছে। তার মধ্যেই এই ঘটনা সামনে এল। সেদেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, চলতি বছরে সেখানে ফাঁসির ঘটনা অনেকটাই বেড়েছে। বিভিন্ন অপরাধে ইতিমধ্যেই কয়েকশো মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
আমিনির পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, ইরানি সাইবার পুলিশ তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের ওপর নজরদারি চালাচ্ছিল। সেখান থেকেই এই মামলার সূত্রপাত। তবে ঠিক কোন পোস্টের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আমিনিকে ১২ বছর ৬ মাস ১ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করা এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
গত জানুয়ারিতে ইরানে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, সেই সময়ই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে এই বিক্ষোভ শুরু হলেও, পরে তা বড়সড় রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রশাসনও কড়া হাতে এই বিক্ষোভ দমন করে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই অশান্তির সময় হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল।
গত মাসে আমিনির একটি অডিও রেকর্ডিং প্রকাশ্যে আসে। সেখানে তিনি তাঁর মামলার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আবেদন জানান। ওই বার্তায় তিনি নিজেকে এক স্বপ্নময়ী তরুণী হিসেবে তুলে ধরেন। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে আর্জি জানান।
অভিযোগের ধরনের জন্যই এই মামলাটি সবার নজর কেড়েছে। ইরানের ইসলামিক দণ্ডবিধি অনুযায়ী, নবী মহম্মদ এবং অন্যান্য শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অপমান করলে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে আইনে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। যেমন, যদি প্রমাণ হয় যে ইচ্ছাকৃতভাবে এই কাজ করা হয়নি, তবে সাজা মকুব হতে পারে।
আদালতের শুনানির রিপোর্ট অনুযায়ী, আমিনি দাবি করেছেন যে বন্ধুদের সঙ্গে 'সাইকেডেলিক মাশরুম' খাওয়ার পর তিনি ঘোরের মধ্যে ছিলেন। সেই অবস্থাতেই তিনি ওই মন্তব্যগুলো করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীরাও আদালতে জানিয়েছেন যে, ওই মন্তব্যগুলো একেবারেই ইচ্ছাকৃত ছিল না।
তবে ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আদালত তাঁর এই যুক্তি খারিজ করে দেয় এবং সাজা ঘোষণা করে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই মামলাটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ইরানে চলতি বছরে যে হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে, তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
ইরানের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন, অনলাইন কার্যকলাপ এবং বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতারি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এমনিতেই কড়া নজরদারি চলছে। তার মধ্যেই এই বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করল।
সাজা ঘোষণা হলেও আইনি প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। আমিনির মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ এখনও চূড়ান্ত নয়। ইরানের সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার রিভিউ বা পুনর্বিবেচনা হবে। আপিলের পর এই সাজা বহাল থাকবে নাকি বাতিল হবে, তা সুপ্রিম কোর্টই ঠিক করবে।