
ওয়াশিংটন: আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর গোয়েন্দা দুনিয়ায় এমন এক খবর ছড়িয়ে পড়েছে, যা দুই পরম বন্ধু দেশ—আমেরিকা ও ইজরায়েলের—সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (পেন্টাগন) ইজরায়েলের থেকে আসা পাল্টা গোয়েন্দা-হুমকির মাত্রা সর্বোচ্চ, অর্থাৎ 'ক্রিটিক্যাল' স্তরে নিয়ে গেছে। পেন্টাগনের একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে যে, ইজরায়েল খোদ আমেরিকার শীর্ষ কর্তাদের ওপরই লাগামছাড়া গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে।
'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস' (NYT) এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, ইজরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মার্কিন প্রশাসনের সেই সব শীর্ষ কর্তাদের ফোনে আড়ি পাতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, যাঁরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানোর কৌশল তৈরি করছেন। ইজরায়েলের এই বিপজ্জনক নজরদারির তালিকায় মূলত তিনটি বড় নাম রয়েছে:
বড় মার্কিন কর্তাদের মতে, ইজরায়েল আসলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধ ও শান্তি আলোচনা সংক্রান্ত গোপন তথ্য আগেভাগেই হাতিয়ে নিতে চাইছে।
ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (DIA)-র কর্তারা এই গোয়েন্দা আগ্রাসনকে "লাগামছাড়া" (unhinged) বলে উল্লেখ করেছেন। তদন্তে জানা গেছে, ইজরায়েলে কর্মরত বা ইজরায়েলি কর্তাদের সঙ্গে কাজ করা অনেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মীর ফোনে গোপনে আড়ি পাতার স্পাইওয়্যার ইনস্টল করে দেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, এখন আমেরিকার শীর্ষ প্রতিনিধিরা ইজরায়েল সফরে গিয়ে হোটেলের ঘরে গোপন আলোচনার জন্য সাধারণ ফোনের বদলে 'বার্নার ফোন' (যে ফোন ট্রেস করা যায় না) ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই গুপ্তচরবৃত্তি প্রথমবার হচ্ছে না, কিন্তু এবার ইজরায়েল সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন কর্তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে এই নজরদারি আরও তীব্র হয়েছিল, যখন তৎকালীন বাইডেন প্রশাসন গাজায় হামলা বন্ধ করার জন্য ইজরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
এর আগেও ইজরায়েলকে হাতেনাতে ধরা হয়েছিল। গত বছর ইজরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা 'শিন বেত'-এর কর্তাদের মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের একটি গাড়িতে আড়ি পাতার যন্ত্র লাগানোর সময় ধরা হয়। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালে ইজরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্তারা ওয়াশিংটনে DIA-এর সদর দফতরের ভিতরেই গুপ্তচর যন্ত্র লাগাতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন।
এই প্রথমবার নয় যে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিষ্ঠানে নজরদারির অভিযোগ উঠল। এর আগেও আড়ি পাতার যন্ত্র বসানো এবং মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঢোকার চেষ্টার খবর সামনে এসেছে। এই নতুন রিপোর্টটি সেই পুরনো ঘটনাগুলিকেই আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে এটি শুধু গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনা থাকবে না, বরং দুই ঘনিষ্ঠ দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি করবে।
এই গোয়েন্দা রিপোর্ট এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিম এশিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতবিরোধ চরমে। খবর অনুযায়ী, গত সপ্তাহেই ইরান যুদ্ধ এবং লেবাননে ইজরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। পেন্টাগনের এই নতুন 'ক্রিটিক্যাল' সতর্কবার্তার পর अब 'ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড' এবং ইজরায়েলের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক কৌশল তৈরিতে বড় বাধা আসতে পারে। সূত্রের খবর, ক্ষুব্ধ মার্কিন কর্তারা এখন ইজরায়েলের সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদানের ওপর কড়া এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা ইজরায়েলের জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে।