
জুন মাস এলেই যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাঙালিদের মনে শুরু হয় এক বিশেষ অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার নাম লন্ডন মহোৎসব। মাত্র তিন বছরের পথচলায় এই উৎসব প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষীদের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আগামী ২৭ ও ২৮ জুন ওয়েম্বলির পাতিদার সেন্টারে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে লন্ডন মহোৎসবের তৃতীয় বর্ষের আয়োজন। প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির চর্চা নতুন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে তার পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে, নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই লন্ডন মহোৎসব হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, শিল্প, খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা সবকিছুর মিলনে এই উৎসব যেন দুই দিনের জন্য গড়ে তোলে এক টুকরো বাংলা।
উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ এর বহুমাত্রিক আয়োজন। এখানে যেমন থাকবে আলোচনা সভা ও মননশীল আড্ডা, তেমনই থাকবে সংগীত, নাটক, শিল্প প্রদর্শনী, বইয়ের স্টল এবং পারিবারিক বিনোদন। ফলে এটি শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এবারের আয়োজনে উপস্থিত থাকছেন বাংলা সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম জগতের একাধিক পরিচিত মুখ। বিশিষ্ট ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখক গৌতম ভট্টাচার্য তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবেন দর্শকদের সঙ্গে। সংগীতপ্রেমীদের জন্য থাকছে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী শ্রাবণী সেনের পরিবেশনা। পাশাপাশি লোকগান ও বাংলা ব্যান্ডসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী সিধুও মঞ্চ মাতাবেন তাঁর স্বতন্ত্র গায়কীতে। অভিনয় ও সাহিত্যজগতের পরিচিত মুখ অঞ্জনা বসু এবং সংগীতশিল্পী পৌষালিও থাকছেন উৎসবে। নাট্যপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে অংশ নিচ্ছেন বাংলা থিয়েটারের দুই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব দেবশঙ্কর হালদার ও কৌশিক সেন। তাঁদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে উৎসবের সাংস্কৃতিক মর্যাদা আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তবে লন্ডন মহোৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তারকাসমাবেশ নয়, বরং প্রবাসী বাঙালি সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সেই ভাবনা থেকেই আয়োজন করা হয়েছে ‘একটুকরো বাংলা’ নামে বিশেষ বাংলা মেলার। এখানে থাকবে বাংলা বই, শাড়ি, পাঞ্জাবি, গয়না, হস্তশিল্প, শিল্পকর্ম এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্টল। দর্শনার্থীরা শুধু কেনাকাটাই নয়, বাংলা সংস্কৃতির নানা রূপের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও পাবেন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের জন্য এই মেলার গুরুত্ব বিশেষ। তাদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে নিজেদের শিকড়, ভাষা ও ঐতিহ্যকে জানার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা। আর বাঙালির উৎসব মানেই খাবারের আয়োজন। তাই এবারের মহোৎসবেও থাকছে রসনাতৃপ্তির বিশেষ ব্যবস্থা। অন্যতম আকর্ষণ কলকাতার জনপ্রিয় আমিনিয়ার বিরিয়ানি। বাংলার পরিচিত স্বাদ ও নস্টালজিয়া প্রবাসের মাটিতে এনে দেবে এক ভিন্ন আবেগ।
উৎসবের দু'দিনই থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশনা, নাট্যআড্ডা, আলোচনা সভা এবং শিশুদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি। ফলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্যই থাকবে আনন্দের আলাদা পরিসর। আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষ ক্রমশ শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রবাসজীবনে। লন্ডন মহোৎসব সেই দূরত্ব কমিয়ে দেয়। এটি শুধু বিনোদনের মঞ্চ নয়, বরং আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে এসে মনে হয়, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধন কখনও ছিন্ন হয় না। তৃতীয় বছরে পদার্পণ করা লন্ডন মহোৎসব তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়। এটি প্রবাসী বাঙালিদের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের উৎসব। দুই দিনের জন্য লন্ডনের হৃদয়ে আবারও গড়ে উঠবে এক টুকরো বাংলা, যেখানে সংগীত, সাহিত্য, নাটক, শিল্প ও খাদ্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হবে বাঙালিয়ানার অনির্বচনীয় টান।