
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ ঘোষণা করেছে যে 'ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড' (USINDOPACOM) আনুষ্ঠানিকভাবে তার আগের নাম 'ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড' (USPACOM)-এ ফিরে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত সেই পুরনো নামেই এই সামরিক কমান্ডটি পুনরায় পরিচিত হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের কর্মপরিধি বা অপারেশনাল এলাকার মানচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কমান্ডটি তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভারতের একটি ভুল মানচিত্রও দেখিয়েছিল। USPACOM-এর ওয়েবসাইটের 'এরিয়া অফ রেসপন্সিবিলিটি ম্যাপ' (দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মানচিত্র) বিভাগে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরকে (PoK) পাকিস্তানের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
এই পদক্ষেপটি ২০১৮ সালে গৃহীত একটি প্রতীকী অথচ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে উল্টে দিচ্ছে। সে সময় তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস এই কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে 'ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড' রেখেছিলেন। ওয়াশিংটন তখন যুক্তি দিয়েছিল যে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে এর ক্রমবর্ধমান একীভূতকরণের বিষয়টি প্রতিফলিত করতেই এই নাম পরিবর্তন করা হয়েছিল। সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করার সময় প্রতিরক্ষা বিভাগ জানায়, মূল নাম ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য হল কমান্ডের ঐতিহাসিক পরিচিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো।
বিভাগটি আরও জানায় যে, USPACOM নাম পুনর্বহাল করার বিষয়টি "কমান্ডের গভীর ঐতিহাসিক শিকড়কে সম্মান জানায় এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত সকলের মধ্যে গর্ব ও সম্মিলিত চেতনার সঞ্চার করে।" মার্কিন কর্তারা জোর দিয়ে বলেন যে, নাম পরিবর্তনের ফলে কমান্ডের পরিচালনগত ভূমিকা, কৌশলগত লক্ষ্য বা ভৌগোলিক কর্মপরিধিতে কোনও পরিবর্তন আসবে না।
বিবৃতি অনুযায়ী, USPACOM-এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকা—যা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের জলসীমা থেকে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত—অপরিবর্তিত থাকছে। বিভাগটি আরও জানায়, আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে একটি মুক্ত ও অবাধ কর্মক্ষেত্র (থিয়েটার) বজায় রাখার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি কোনও বাধা ছাড়াই অব্যাহত থাকবে।
কমান্ডটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
১৯৪৭ সালের ১ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের আমলে প্রতিষ্ঠিত এই কমান্ডটি মার্কিন সামরিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম 'ইউনিফাইড কমব্যাট্যান্ট কমান্ড'-এ পরিণত হয়। কয়েক দশক ধরে এটি এশিয়া জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি কোরিয়া যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো বড় সংঘাতের সময় যৌথ সামরিক অভিযানের সমন্বয় এবং মানবিক ও দুর্যোগ-মোকাবিলায়ও এটি সক্রিয় ছিল।
সর্বশেষ এই পরিবর্তনের আগে পর্যন্ত USINDOPACOM বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল জুড়ে সামরিক অভিযান, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রধান মার্কিন সামরিক কমান্ড হিসেবে কাজ করে আসছিল। হাওয়াই-ভিত্তিক এই কমান্ডটি প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগরের বিশাল অংশ, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত এক বিশাল কৌশলগত অঞ্চলের তদারকি করে। এর দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত—প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি, সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা পর্যন্ত।
২০১৮ সালে কমান্ডের নাম পরিবর্তন
২০১৮ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ (Indo-Pacific Command) রাখার বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে দেখা হয়েছিল। এটি ওয়াশিংটনের এই স্বীকৃতিরই ইঙ্গিত ছিল যে, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার ঘটনাপ্রবাহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সাথে ক্রমশ গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ভারতের জন্য আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ‘ইউএস-ইন্দোপ্যাককম’ (USINDOPACOM) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়।
যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর আওতায় ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক কার্যকলাপের সঙ্গে এই কমান্ডটি নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। এর দায়িত্বের এলাকা এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি—সামুদ্রিক পথ সুরক্ষিত রাখা, নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরজুড়ে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়ে চলমান আঞ্চলিক আলোচনার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।