
কাঠমান্ডু: তিব্বত সীমান্তের কাছে উত্তর নেপালে বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বান হিমালয়ের এই দেশটিকে আবার কান্নায় ডুবিয়েছে। এই বিপর্যয়ে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৭৭ জন ভারতীয়-সহ প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ। ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) জানাচ্ছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় বিশাল বরফ ও পাথরের চাঁই ধসে পড়ার কারণেই লেন্ডে ও ভোটে কোশি নদীর অববাহিকায় কাদা আর ধ্বংসস্তূপ মেশানো জলের স্রোত নেমে আসে। বাড়িঘর, রাস্তা, پل, আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো চোখের পলকে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, মাত্র ১,৪৭,৫১৬ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট দেশ নেপাল কেন বারবার এত বড় দুর্যোগের কেন্দ্র হয়ে উঠছে?
নেপালের ভূপ্রকৃতি বেশ অদ্ভুত। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬০ মিটার উঁচু তরাই সমভূমি, আর সেখান থেকে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০ কিলোমিটারের মধ্যে সোজা ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার উঁচু মাউন্ট এভারেস্ট। এই 엄청 جغرافیایی পরিবর্তন খুব কম দূরত্বের মধ্যে ঘটেছে।
হড়পা বানের কারণ: খাড়া ঢালের কারণে বৃষ্টির জল আর পাথর খুব দ্রুতগতিতে উপত্যকার দিকে নেমে আসে। হিমালয় থেকে তৈরি হওয়া ৬,০০০-এরও বেশি নদী এভাবেই নিচের দিকে বয়ে যায়।
নবীন পর্বতমালা: ভূতাত্ত্বিকভাবে হিমালয় আসলে নবীন পর্বতমালা। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটগুলো এখনও একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, তাই এই অঞ্চল অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। ২০১৫ সালের গোর্খা ভূমিকম্পে প্রায় ৯,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিলেন এবং প্রায় ২৫,০০০ ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছিল।
বিশ্ব উষ্ণায়ন নেপালের পরিবেশকে বিপজ্জনকভাবে বদলে দিচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক বাঁধের পিছনে বিশাল হিমবাহ হ্রদ (Glacial lakes) তৈরি হচ্ছে। এই হ্রদগুলোর ধার যখন ভেঙে যায়, তখন 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড' (GLOFs) হয়, যা নিমেষের মধ্যে গোটা উপত্যকাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানব বিপর্যয়ে পরিণত করার পিছনে অবৈজ্ঞানিক নির্মাণকাজের বড় ভূমিকা আছে:
* সমতল জমির অভাবে বেশিরভাগ জনবসতি আর বাজার নদীর ধারেই গড়ে উঠেছে।
* পাহাড়ের ঢাল কেটে রাস্তা তৈরি এবং নির্বিচারে বন ধ্বংসের ফলে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়ছে।
* দেশের অর্থনীতির ভিত্তি যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো, সেগুলোও নদীর অববাহিকায় তৈরি। তাই হড়পা বানের মুখে এগুলো সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়।
ভূমিকম্প বা বর্ষাকে আটকানো সম্ভব না হলেও, আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে প্রাণহানি কমানোর চেষ্টা করছে নেপাল। বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং হিমবাহ সংক্রান্ত বিপদ একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের জন্য দেশটি একটি 'মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম' (Multi-Hazard Early Warning System) চালু করেছে। দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পরিকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য বিশ্বব্যাংক ১৫০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সাহায্যও অনুমোদন করেছে।