
Nepal Flood: প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে কেবল ঘরবাড়ি আর স্থাবর সম্পত্তির ধ্বংসাবশেষই পাওয়া যায় না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অজস্র না-বলা গল্প ও গভীর আবেগের ক্ষত। গেল সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালের ত্রিশূলী বাজারের এক টুকরো কাদামাখা জমি এখন তেমনই এক মর্মস্পর্শী ঘটনার সাক্ষী হয়ে উঠেছে। প্রলয়ংকারী বানের জলে এক নিমেষে ভেসে গিয়েছে সারিবদ্ধ চারটি বসতবাড়ি। চারিদিকে এখন শুধুই থকথকে পলি, উপড়ে আসা বিশাল গাছের গুঁড়ি আর কংক্রিটের ভাঙা টুকরো। এই চরম সর্বনাশের মাঝে দাঁড়িয়ে এক অবোধ্য প্রাণীর অটল আনুগত্য এবং শোকের ছবি দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মীরা।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এক টুকরো জমাট বাঁধা কাদার ওপর টানা বসে রয়েছে একটি মাঝারি আকারের সাদা-কালো রঙের কুকুর। গলায় এখনও স্পষ্ট ঝুলছে মালিকের সযত্নে পরিয়ে দেওয়া বেল্টটি। আশপাশে চলছে ভারী যন্ত্রপাতির তাণ্ডব, অন্তত হাফ ডজন জেসিবি (JCB) এক্সকাভেটর কাদা ও ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছে। ধাতব যন্ত্রপাতির বিকট শব্দ, শত শত মানুষের চিৎকার আর উদ্ধারকর্মীদের আনাগোনার মধ্যেও নিজের স্থান থেকে একচুলও নড়তে নারাজ এই পোষ্যটি। তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট স্থানের ওপর, যেখানে কয়েক দিন আগেও ছিল তার চেনা বাড়ির সামনের প্রধান প্রবেশদ্বার বা মূল ফটক।
দেখুন খবরটি
A black-and-white dog, its collar still intact, has refused to leave the site of a row of four homes washed away in last week's flood in #Trishuli Bazaar, remaining in the same muddy patch even as half a dozen JCBs and rescue workers clear timber, silt and debris around him. He… pic.twitter.com/Nfx82QNEE9
— The Times Of India (@timesofindia) September 1, 2026
উদ্ধারকারীরা যতবারই তাকে সরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, সে ঘুরেফিরে আবার সেই কাদার ওপর গিয়েই অবস্থান নিচ্ছে। চারপাশের ব্যস্ততা বা অপরিচিত মানুষদের চলাফেরা তাকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করছে না। কোনো অজানা ভয়ে সে পালিয়েও যাচ্ছে না, আবার মানুষের উপস্থিতিতে সাধারণ কুকুরের মতো লেজ নাড়িয়ে কোনো অনুভূতিও প্রকাশ করছে না। এক নীরব ও গভীর শোকে যেন সম্পূর্ণ জমে পাথর হয়ে গিয়েছে সে।
দেখুন ভিডিও
This loyal dog returned home looking for its owner, who was likely swept away by the deadly flash floods that devastated parts of the Nepal–Tibet region pic.twitter.com/fZXkFXPRPG
— Surajit (@surajit_ghosh2) August 31, 2026
কী বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা
ঘটনাস্থলে নিয়োজিত ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দলের স্বেচ্ছাসেবী বিক্রম থাপা সেই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, "বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার পর থেকেই আমরা কুকুরটিকে এই একই জায়গায় বসে থাকতে দেখছি। আমরা প্রথম থেকেই ওকে ওখান থেকে সরিয়ে এনে কিছুটা খাবার ও আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। বিস্কুট খাইয়ে বা সাধারণ যেসব নামে মানুষ পোষা প্রাণীদের ডেকে থাকে, সেসব নামে ডেকে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে একবারের জন্যও মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকায়নি। খাবার ছুঁয়ে দেখাও তো দূরের কথা, কোনো ডাকেই তার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।"
স্থানীয় অধিবাসীদের ধারণা, যে চারটি বাড়ি বন্যায় সম্পূর্ণ তলিয়ে গিয়েছে, তারই কোনো একটির বাসিন্দা ছিল এই অনুগত কুকুরটি। বন্যার প্রলয়ে হয়তো তার পরিবারের সদস্যরা ভেসে গিয়েছেন অথবা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু বাড়ির পোষ্যটি নিজের দায়িত্ব ভুলে যায়নি। সে বিশ্বাস করে বসে আছে, তার পরিবার বা মালিক ঠিক কোনো এক সময়ে এই স্থান দিয়েই ফিরবে। আর তাই চারপাশে ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা সত্ত্বেও সে তার চেনা ঘরের দুয়ার পাহারা দিয়ে চলেছে।
প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, কুকুরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী তাদের প্রিয়জন বা মালিকদের সাথে একটি গভীর মানসিকভাবে যুক্ত থাকে। কোনো বড় দুর্যোগের পর নিজেদের পরিচিত মানুষ বা আশ্রয় হারিয়ে তারা চরম আঘাত পায়। এমন অবস্থায় তাদের অনেকেই গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে চলে যায় এবং খাওয়া-দাওয়া বা বাইরের পৃথিবীর সাড়াশব্দ বন্ধ করে দিয়ে স্মৃতি জড়িয়ে থাকা স্থানেই পড়ে থাকে। ত্রিশূলী বাজারের এই সাদা-কালো পোষ্যটির আচরণে সেই চরম মানসিক আঘাতেরই প্রতিফলন ঘটছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন
ত্রিশূলী বাজারের এই ঘটনাটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অনেকেই প্রাণীটির অনুভূতির গভীরতা দেখে স্তম্ভিত। জল-কাদায় ভেজা সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পোষ্যটির ছবি এখন শুধুই প্রলয়ের চিহ্ন নয়, বরং মানুষের প্রতি একটি প্রাণীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, বিশ্বাস ও অটল আনুগত্যের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই স্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রাণী কল্যাণ সংস্থা উদ্ধারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যাতে কুকুরটিকে কোনো আঘাত না করে বা ভয় না দেখিয়ে উদ্ধার করে নিরাপদে কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া যায় এবং তার উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।