
নেপালের প্রাক্তন বন ও পরিবেশমন্ত্রী মাধব প্রসাদ চৌলাগাইন দাবি করেছেন যে নেপালে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যার আগে চিন তাদের কোনও সতর্কবার্তা দেয়নি। এই বন্যায় শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বুধবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত দিয়ে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত ধেয়ে আসার আগে চিনের কাছ থেকে কোনও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা পায়নি নেপাল। চৌলাগাইন বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যর্থতার কারণে মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
২০২৫ সালে হিমবাহ সংক্রান্ত ছোট একটি ঘটনার পর একটি সমঝোতা প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু সেই ব্যবস্থাটি কাজে লাগানো হয়নি। তিনি বলেন, "আমরা সেই সুযোগটি হাতছাড়া করেছি।" তিনি বেজিংয়ের সেই দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন যে ধসের ঘটনাটি নেপালের ভূখণ্ডে শুরু হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঘটনাটির সূত্রপাত হয়েছিল তিব্বতে। এই বিষয়ে আরও স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "বিষয়টি খুব একটা স্পষ্ট নয়।" চৌলাগাইন যুক্তি দেন যে, এই দুর্যোগ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গভীর ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, নেপালের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের প্রক্রিয়াগুলো মূলত হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলোর উপরই কেন্দ্র করে সাজানো ছিল। কিন্তু এবারের ঘটনায় বরফ ও পাথরের পতন এবং হিমবাহ-নির্ভর নদী ব্যবস্থার ধস ঘটেছিল—যা কখনও কল্পনাই করা হয়নি। তিনি নেপাল-চিন-ভারতের মধ্যে কার্যকর সতর্কবার্তা ব্যবস্থার অনুপস্থিতিকে পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তথ্য গোপন করা মানবতার পরিপন্থী।
নেপালের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কাঠমান্ডুতে অবস্থিত চিনা দূতাবাস পরপর তৃতীয়বারের মতো এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, চিনা বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছেন এবং সময়মতো নেপালের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিময় করেছেন। দূতাবাস উল্লেখ করেছে যে, হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলো অত্যন্ত বিস্তৃত ও বিক্ষিপ্ত। সেখানে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় অসংখ্য হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ এবং বিশাল আকারের বরফ ও পাথরের স্তূপ রয়েছে। অত্যন্ত শীতল ও দুর্গম ভূখণ্ডে সরেজমিনে ব্যাপক জরিপ পরিচালনা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলেও তারা জানিয়েছে। এ ছাড়া দূতাবাস ওই অঞ্চলের খাড়া ঢাল এবং বিশাল ও জটিল ভূ-প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনা করা একটি আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ। তারা আরও জানায়, ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালের শিলা কাঠামোকে প্রভাবিত করেছিল, যার ফলে অধিক উচ্চতার এলাকায় পাথর বা শিলাখণ্ড সরে যাওয়ার ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দূতাবাস জানায়, আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নেপাল ও চিনের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়ে আলোচনার জন্য গত ২৬ আগস্ট চিনের আবহাওয়া প্রশাসন (China Meteorological Administration) নেপালের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। চিন জানিয়েছে, তারা নেপালের সঙ্গে জল-আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য—যার মধ্যে 'ব্যারিয়ার লেক' বা প্রাকৃতিক বাঁধ-সৃষ্ট হ্রদ সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ তথ্যও অন্তর্ভুক্ত—নিয়মিত বিনিময় করে আসছে। এ ছাড়া তারা নেপালকে আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার আওতায় তথ্য সরবরাহ করছে। দূতাবাসের মতে, এই পদক্ষেপ উভয় দেশের আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও জোরদার করবে। দূতাবাস উল্লেখ করেছে যে, এসব পদক্ষেপ নেপালের দুর্যোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার প্রতি চিনের প্রতিশ্রুতিকেই প্রতিফলিত করে এবং তারা আশা প্রকাশ করেছে যে, দুই দেশের মধ্যেকার সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে।
শনিবার নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬-এ দাঁড়িয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো টানা চতুর্থ দিনের মতো অনুসন্ধান ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ২,৫০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও এখনও ২,৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের জন্য ৫,০০০-এর বেশি নেপালি সেনা-সহ মোট ১১,০০০-এরও বেশি নিরাপত্তা কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে।