
ভোটেকোশী নদীর হড়পা বানে ভেসে যাওয়া মানুষদের দেহ এখন নদীর স্রোতে ভাটির দিকে আসছে। আর এর জেরে হাসপাতালগুলো দেহ শনাক্ত করা এবং সংরক্ষণের জায়গা খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। একদিকে সব হারানোর হাহাকার, অন্যদিকে লাশপচার গন্ধ! সবমিলিয়ে নেপালের পরিস্থিতি দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।
মর্গে আর জায়গা নেই
গোটা নেপাল জুড়ে মর্গগুলিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫০টি দেহ রাখার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু মৃতের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় দেহ শনাক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার আগে পর্যন্ত সেগুলি রাখার জায়গার তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। রাসুওয়া এবং নুওয়াকপারাসি থেকে বন্যায় ভেসে যাওয়া দুর্গতদের দেহ নুওয়াকোট এবং তারও ভাটিতে চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপারাসি পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। চিতওয়ান জেলা ইতিমধ্যেই ভেসে আসা লাশে ভরে গিয়েছে। এর ফলে কর্তৃপক্ষ অস্থায়ী মর্গ তৈরির ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছে। একইসঙ্গে, পোখরার হাসপাতালগুলোও জানিয়েছে যে বিভিন্ন জেলা থেকে দেহ আসতে শুরু করায় তাদের মর্গগুলোও ভরে উঠছে।
দেহ উদ্ধার হলেও তা রাখার জায়গা নেই!
নেপাল পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট রামেশ্বর পাউডেল ANI-কে বলেন, "পুলিশ টিম নামিয়ে নদী থেকে সব দেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। আমরা প্রথমে দেহগুলো নদী থেকে তুলছি, সেগুলোর ক্লোজ-আপ ছবি নিচ্ছি। দেহ অপরিষ্কার থাকলে, প্রথমে পরিষ্কার করে বডি ব্যাগে রেখে ট্যাগ লাগিয়ে এই অস্থায়ী দেহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে নিয়ে আসছি। এখানে আমরা এসি চালিয়ে ঘরের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রিতে রাখছি। পরিচয় শনাক্ত করতে সমস্যা হওয়ায় আমরা এই ব্যবস্থা নিয়েছি। নিখোঁজদের কোনও আত্মীয় খোঁজ করতে এলে আমরা উদ্ধার হওয়া দেহের ছবিগুলো দেখাচ্ছি। তাঁরা নিজেদের পরিজনের দেহ শনাক্ত করতে পারলে, আমরা পদ্ধতি মেনে তা হস্তান্তর করছি।"
হাসপাতালগুলো বিপুল সংখ্যক দেহ নিয়ে সমস্যায় পড়ায়, কর্তৃপক্ষ এখন ভরতপুরে একটি অস্থায়ী দেহ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। ভরতপুর মেট্রোপলিটন সিটি-১০-এর বিদ্যুৎ রোডে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের একটি অব্যবহৃত ভবনকে এই অস্থায়ী কেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হবে।
চিতওয়ানের ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর ফিশলিং থেকে গোলাঘাট পর্যন্ত এলাকা থেকে প্রায় ২০০টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৫০টি দেহ রাখা যায়। সেই ক্ষমতা ইতিমধ্যেই পূর্ণ হয়ে যাওয়ায়, অস্থায়ী কেন্দ্রটিতে প্রায় ২৫০টি দেহ রাখার ব্যবস্থা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চিতওয়ান থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দূরে পোখরাতেও একই চিত্র। বন্যার পর সেখানেও ক্রমাগত দেহ ভেসে আসছে। বিভিন্ন জেলায় জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ায় পোখরাতে দেহ নিয়ে আসা হয়েছে। তানাহুন, গোর্খা, নওয়ালপারাসি ইস্ট এবং ধাডিং থেকে মোট ৯৩টি দেহ এই শহরে আনা হয়েছে।
কাস্কি জেলার চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার কুমান সিং গুরুং ANI-কে বলেন, "(কাস্কি জেলার) হাসপাতালগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৮৮। বন্যার আগেই আমাদের মর্গে ৫টি দেহ ছিল। এরপরেও তানাহুন থেকে ৯টি, নওয়ালপারাসি ইস্ট থেকে ২৭টি এবং ধাডিং থেকে ২০টি দেহ এসেছে। সব মিলিয়ে আমাদের এখানে ৪৭টি নতুন দেহ এসেছে।" পোখরা অ্যাকাডেমি অফ হেলথ সায়েন্সে ৭২টি, নেপাল মণিপাল টিচিং হাসপাতালে আটটি এবং গণ্ডকী মেডিক্যাল কলেজ, ফিশটেল হাসপাতাল, চরক মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও ফেওয়া সিটি হাসপাতালে দুটি করে দেহ রাখার জায়গা রয়েছে। এখনও আরও দেহ উদ্ধার হচ্ছে। অশনাক্ত দেহ দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। কর্তৃপক্ষ 'আনআইডেন্টিফায়েড অ্যান্ড আনক্লেইমড বডিজ ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনস, ২০২১' মেনে দেহগুলির ব্যবস্থা করছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, জেলা পুলিশ প্রধানের নেতৃত্বে একটি কমিটি দেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে।
কাস্কি জেলার পুলিশ প্রধান নবীন কার্কি ANI-কে বলেন, "'আনআইডেন্টিফায়েড অ্যান্ড আনক্লেইমড বডিজ ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনস, ২০২১' অনুযায়ী জেলা পুলিশ প্রধানের নেতৃত্বে একটি কমিটি দেহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। আমরা প্রথমে দেহগুলির ছবি তুলি, আঙুলের ছাপ নিই, পোস্টমর্টেম করি এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করি। যেখানে মুখ দেখে চেনা সম্ভব, সেখানে ছবি প্রকাশ করা হয় যাতে পরিবারগুলো তাদের পরিজনদের শনাক্ত করতে পারে। যদি আত্মীয়দের খুঁজে না পাওয়া যায় বা দেহ শনাক্ত করা না যায়, আমরা সেগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাখতে পারি না, কারণ আগেই আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা থাকে। পরে, নির্দেশিকা মেনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় ট্যাগ দিয়ে দেহগুলির সৎকার করি।"
পুলিশের আশঙ্কা, বিভিন্ন জেলা থেকে দেহ আসতে থাকায় অশনাক্ত লাশের সংখ্যা আরও বাড়বে। তাই কমিটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে অশনাক্ত দেহগুলির ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।