
Norway Data Centre: নরওয়েতে ডেটা সেন্টারের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। আগামী দশকে এই খাতে বিদ্যুতের চাহিদা আকাশছোঁয়া হতে পারে বলে নতুন এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। এর ফলে দেশে বিদ্যুতের জোগান, দাম এবং জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দেওয়া নতুন রিপোর্টের পর, রাজনীতিবিদরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ঠিক কতটা পড়বে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত নতুন ডেটা সেন্টার তৈরিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ চাইছেন অনেক আইনপ্রণেতা। নরওয়েতে এখন সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি করছে এই ডেটা সেন্টারগুলো। কয়েক বছর আগেও দেশের অর্থনীতিতে এদের তেমন কোনও প্রভাব ছিল না। কিন্তু এখন ডেটা সেন্টারগুলো বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ টেনে নিচ্ছে, যা গোটা দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২.৫ শতাংশ। নতুন নতুন ডেটা সেন্টার গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এই সংখ্যাটা আরও দ্রুত বাড়বে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্তারা।
নরওয়েজিয়ান ওয়াটার রিসোর্সেস অ্যান্ড এনার্জি ডিরেক্টরেট-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে শুধুমাত্র অনুমোদিত ডেটা সেন্টারগুলোর জন্যই ২৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। এই বিপুল চাহিদার জেরে সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য শিল্পে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেবে কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। নরওয়ের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মূলত জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল এবং সাধারণত তাদের কাছে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকে। তবে সাম্প্রতিক মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে, নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা সেভাবে না বাড়ায় এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের জোগান নিয়ে বড়সড় সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও তুঙ্গে। সমালোচকদের দাবি, বড় বড় ডেটা সেন্টারগুলো প্রচুর বিদ্যুৎ গিললেও সেই তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। সরকারের করানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এই শিল্প থেকে সরাসরি প্রায় ৩২০ কোটি নরওয়েজিয়ান ক্রোন আয় হবে এবং মাত্র ৬০০ জনের মতো মানুষের পূর্ণ সময়ের কর্মসংস্থান হবে। এই সামান্য লাভের জন্য আগামী দিনে এত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করা আদৌ যুক্তিযুক্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ডেটা সেন্টারগুলোর এই অবাধ বিস্তার নরওয়ের সার্বিক বিদ্যুৎ নীতির সঙ্গে কতটা মানানসই, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। যারা নতুন প্রকল্পের অনুমোদনে কড়াকড়ি চাইছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছেন। সংসদে একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—বিদ্যুতের জোগান ও দামের ওপর ডেটা সেন্টারের প্রভাব খতিয়ে না দেখা পর্যন্ত নতুন অনুমোদনে স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। এই পদক্ষেপের সমর্থকদের যুক্তি, দেশের অর্থনীতির জন্য বেশি লাভজনক খাতগুলোতেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই বিতর্ক আসলে গোটা বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিরই একটা প্রতিচ্ছবি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল পরিষেবার হাত ধরে বিশ্বজুড়েই ডেটা সেন্টার তৈরির হিড়িক পড়েছে। এর ফলে বিদ্যুতের চাহিদা, পরিকাঠামোর ক্ষমতা এবং বিদ্যুতের দাম নিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রচুর পরিমাণে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎস থাকায় ডিজিটাল পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের জন্য নরওয়ে বরাবরই আকর্ষণীয় গন্তব্য। কিন্তু এই সুবিধার কারণেই এখন উল্টো বিপদ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারও এই সমস্যার কথা স্বীকার করে নিয়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্ভাব্য উপায়গুলো খতিয়ে দেখছে।
আধিকারিকরা জানিয়েছেন, নতুন ডেটা সেন্টারগুলো যাতে জাতীয় অগ্রাধিকার এবং বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—উভয় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েই কাজ চলছে।দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর সেগুলোর প্রভাব খতিয়ে দেখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল পরিকাঠামো থেকে আসা আর্থিক সুযোগের সঙ্গে ভবিষ্যতের বিদ্যুতের জোগানের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিই এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।