
চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধ তেল সঙ্কটকে আরও গভীর করেছে, যা পাকিস্তানকে আরও বিপাকে ফেলেছে। একদিকে, ভারতের প্রতিবেশী দেশটির ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে। তার পরে গোদের উপর বিষফোড়া আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ। এই ত্রিমুখী আঘাত পাকিস্তানের তেল সম্পদ নিঃশেষ করে দিয়েছে। ইরানে যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সঙ্কটকে আরও তীব্র করেছে। পাকিস্তান একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে এবং এটি কাটিয়ে উঠতে মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করে আসছে। তবে, উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পাওয়া সত্ত্বেও দেশটির অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ পাকিস্তানের মোট ঋণ ৭৯.৩২২ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিতে পৌঁছেছে।
স্টেট ব্যাঙ্ক অফ পাকিস্তান কর্তৃক প্রকাশিত নথি অনুসারে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঋণ তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক (এসবিপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ দেশের ফেডারেল সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ৫৫,৯৭৮ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিতে পৌঁছেছে। এছাড়াও, বৈদেশিক ঋণ ২৩,৩৪৪ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিতে দাঁড়িয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান আইএমএফ-এর কাছে বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা এবং ১৯৫৮ সাল থেকে আইএমএফ-এর ২৬টি বেলআউট কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পেয়েছে। অসংখ্য প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে যে, আইএমএফ ঋণের উপর নির্ভরশীল পাকিস্তান ইতোমধ্যেই দেউলিয়াত্বের সম্মুখীন এবং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, পাকিস্তানে বিশৃঙ্খলা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পাকিস্তানের উপর দ্বিতীয় আঘাত হেনেছে। প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ তেল সঙ্কটকে আরও গভীর করেছে, যা তেল আমদানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল পাকিস্তানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এই ঘাটতির কারণে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে, সরকারি যানবাহনের সংখ্যা ৬০% কমেছে, সাংসদ ও মন্ত্রীদের বেতন হ্রাস পেয়েছে, সরকারি দফতরগুলোতে অনাবশ্যক ব্যয় ২০% কমেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের ভার্চুয়াল মিটিং ও অনলাইন শিক্ষার মতো অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী হাফিজ পাশা সতর্ক করেছেন যে, যদি যুদ্ধ চলতে থাকে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে থাকে, তবে পাকিস্তানের জিডিপি ১-১.৫% নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। পেট্রোলিয়াম আমদানি বৃদ্ধির কারণে আগামী বছর পাকিস্তানের ১২-১৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে। আরেকটি সঙ্কটের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের মতো যদি অপরিশোধিত তেলের দাম ১২০ ডলারে পৌঁছয়, তবে পাকিস্তানে মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং তা প্রায় ৩০% হারে পৌঁছতে পারে। সেই সময় মানুষ আটা ও ডালের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, আর এখন জ্বালানির ঘাটতি আবারও পাকিস্তানকে তাঁর সম্পদ থেকে বঞ্চিত করছে।
পাকিস্তানের উপর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সাম্প্রতিক প্রভাব সম্পর্কে বলতে গেলে, পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাপ্তাহিক মুদ্রাস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী, ১১ মার্চে সমাপ্ত সপ্তাহে মুদ্রাস্ফীতি সূচক (এসপিআই) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৪৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। পেট্রোল ও হাই-স্পিড ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও তীব্রভাবে বেড়েছে। রুটি ও দুধ থেকে শুরু করে আটা, ডাল ও চাল পর্যন্ত সকল খাদ্যপণ্যের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ পাকিস্তানের আগে থেকেই বিদ্যমান সঙ্কটময় সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে, সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ২০২৫ সালের শেষের দিকে এই সংঘাত শুরু হয় এবং এখন তা এক গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের উত্তেজনার কারণে আমদানি ও রফতানি মন্থর হয়ে পড়েছে। সীমান্ত উত্তেজনার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চলাচল ব্যাহত হয়েছে, যার ফলে পাকিস্তানে সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের জনগণ এক মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতির বোঝা বহন করছে।
বিশেষ করে তোরখাম ও চামান সীমান্তের মতো রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে আফগান কয়লার ঘাটতি পাকিস্তানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সিমেন্ট উৎপাদনকারীরাও তীব্র চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন।