
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর নেতৃত্বাধীন ইরানের ইসলামিক শাসনের বিরুদ্ধে তেহরানে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিপর্যস্ত অর্থনীতির মধ্যে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে ক্ষুব্ধ ইরানিরা রাস্তায় নেমে এসে ক্ষমতাসীন ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অধীনে ইরানের সরকার ইন্টারনেট এবং আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এদিকে, দেশের বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানরা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অন্তত কয়েকজনকে নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির ডাকা বিক্ষোভে সাড়া দিতে দেখা গিয়েছে। পাহলভির বাবা ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের ঠিক আগে ইরান থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বিক্ষোভগুলোতে শাহের সমর্থনে স্লোগান দেওয়া হয়েছে, যা অতীতে মৃত্যুদণ্ডের কারণ হতে পারত, কিন্তু এখন এটি ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পুরনো ক্ষোভকেও তুলে ধরছে।
পাহলভি ফিরে আসবেন
পাহলভি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ঘড়ির কাঁটা ৮টা বাজতেই তেহরানের বিভিন্ন এলাকা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। স্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল 'স্বৈরশাসকের পতন হোক!' এবং 'ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন হোক!' অন্যরা শাহের প্রশংসা করে স্লোগান দিচ্ছিল, 'এটা শেষ যুদ্ধ! পাহলভি ফিরে আসবেন!' পাহলভি বলেন, 'আজ রাতে ইরানিরা তাদের স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সরকার যোগাযোগের সমস্ত লাইন কেটে দিয়েছে। তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ল্যান্ডলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। তারা এমনকি স্যাটেলাইট সংকেত জ্যাম করারও চেষ্টা করতে পারে।'
তিনি ইউরোপীয় দেশগুলির নেতাদের ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাহায্য চেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, 'আমি তাঁদের প্রতি আহ্বান জানাই, তাঁরা যেন ইরানি জনগণের কাছে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সমস্ত প্রযুক্তিগত, আর্থিক এবং কূটনৈতিক সম্পদ ব্যবহার করেন, যাতে ইরানিদের কণ্ঠস্বর ও ইচ্ছা শোনা এবং দেখা যায়। আমার সাহসী দেশবাসীদের কণ্ঠস্বরকে নীরব হতে দেবেন না।'
পাহলভি বলেছিলেন যে তাঁর আহ্বানের প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে তিনি আরও পরিকল্পনা পেশ করবেন। ইজরায়েলের প্রতি তাঁর সমর্থন এবং ইজরায়েলের কাছ থেকে তাঁর সমর্থন অতীতে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে—বিশেষ করে জুনে ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে ১২ দিনের যুদ্ধ করেছিল তার পর। কিছু বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীরা শাহের সমর্থনে স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু এটি স্পষ্ট নয় যে এটি পাহলভির প্রতিই সমর্থন নাকি ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের আগের সময়ে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
ইরানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে
ইরানের শহর ও গ্রামীণ এলাকা জুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তা বৃহস্পতিবারও অব্যাহত ছিল। বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে আরও অনেক বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হিংসায় অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন এবং ২,২৭০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। যার কারণে ঘরেই চাপে রয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনি। ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা ক্লাউডফ্লেয়ার এবং অ্যাডভোকেসি গ্রুপ নেটব্লকস ইন্টারনেট বিভ্রাটের খবর দিয়েছে এবং উভয়ই এর জন্য ইরান সরকারের হস্তক্ষেপকে দায়ী করেছে। দুবাই থেকে ইরানে ল্যান্ডলাইন ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ স্থাপন করা যায়নি। অতীতেও এ ধরনের বিভ্রাটের পর সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র দমনপীড়ন চালানো হয়েছে। এদিকে, বিক্ষোভগুলো সামগ্রিকভাবে নেতৃত্বহীনই রয়ে গেছে। পাহলভির এই আহ্বান ভবিষ্যতে বিক্ষোভের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনও অস্পষ্ট।