
ইউরোপে এক সপ্তাহের মধ্যে রেকর্ড-ভাঙা তাপপ্রবাহে ১,৩০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মহাদেশের বিশাল অংশজুড়ে তীব্র তাপমাত্রা অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ২১ জুন থেকে ২৮ জুনের মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো রেকর্ড করা হয়েছে। এই সময় ইউরোপ সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছিল।
তাপপ্রবাহের সময় ফ্রান্সে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১,০০০ বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা দেশটিকে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। মৃতদের অধিকাংশই ছিলেন বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের অনেকে একা বসবাস করতেন অথবা আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
তীব্র গরমের এই পরিস্থিতি পশ্চিম ইউরোপ ছাড়িয়ে জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র এবং হাঙ্গেরিতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দেশেও ব্যাপক তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। জার্মানির কিছু অংশে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে বার্লিনে জলকামানবাহী গাড়ি মোতায়েন করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া জলকামান ব্যবহারের ভিডিওগুলোতে এই বিশেষ পদক্ষেপের চিত্র ফুটে উঠেছে।
এই তাপপ্রবাহ মহাদেশজুড়ে জনজীবনেও ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে তাপজনিত জরুরি পরিস্থিতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং নদীগুলোর জলের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞানীরা বর্তমান ঘটনাটিকে ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এর তীব্রতার সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে যে, ইউরোপে জলবায়ু-সম্পর্কিত মৃত্যুর প্রধান কারণ হল তাপজনিত ধকল বা 'হিট স্ট্রেস'। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জনসাধারণকে—বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিদের—দীর্ঘ সময় রোদে থাকা থেকে বিরত থাকতে, শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সম্ভব হলে অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। ইউরোপের বাড়িঘর, অফিস ও স্কুলগুলো তীব্র গরম মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নয়। পুরনো ভবনগুলোতে প্রায়শই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকে না। এমনকি গ্রীষ্মকালেও রাতে তাপমাত্রা কমে না, ফলে মানুষ স্বস্তি পাওয়ার বা শরীর ঠান্ডা করার সুযোগ পায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেডরস আধানম গেব্রেইয়েসুস জানিয়েছেন যে, বর্তমানে ১৫ কোটি মানুষ তীব্র দাবদাহের মধ্যে জীবনযাপন করছে; এতে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগে যেসব দাবদাহ ‘এক প্রজন্মে একবার’ দেখা যেত, এখন তা প্রতি বছরই ঘটছে।