Brazil President Lula: লাতিন আমেরিকায় তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন। কার্যত, অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছেন যিনি, সেই লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ফের একবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এই নিয়ে চারবার তিনি দেশের প্রেসিডেন্টের হটসিটে বসতে চলেছেন (Brazil President Lula)। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে প্রথম দফার ভোটের পরাজয়কে রীতিমতো উল্টে দিয়ে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনঃর্নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তবে এটিই কিন্তু প্রথম নয়। তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম মেয়াদ ছিল ২০০৩ - ২০০৬, এরপর ২০০৭ - ২০১১ এবং তৃতীয়বারের জন্য ২০২৩ - ২০২৬ অবধি লুলা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। তারপর আবারও চলতি বছরের ২৫ অক্টোবর, অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক রান-অফ নির্বাচনে তিনি উগ্র-ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের জন্য জয়লাভ করলেন। নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক এক রেকর্ড বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে (Brazil President news)।
বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার এই ফুটবল খেলিয়ে জনপ্রিয় দেশের অন্যতম এক বামপন্থী নেতা হলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। দীর্ঘদিন লড়াকু আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে তিনি আজ রাষ্ট্রপতির পদে আসীন। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সী লুলা ব্রাজিলের মতো বিশাল এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক। তিনি লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী নেতাদের জয়ের ধারাকে কার্যত, অকপটে উল্টে দিয়েছেন। যাদের সঙ্গে আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনেকটাই মিল রয়েছে। কিন্তু এই বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়কের ইতিহাস জানেন? এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান লুলা তাঁর ছোটবেলায় চিনেবাদাম বিক্রি করতেন। এমনকি, জুতো পালিশের কাজও করেছেন রোজগার করার জন্য।
তবে সেখানেই শেষ নয়। লড়াই যেন ছোট থেকেই তাঁর রক্তে। এরপর একটা সময়, ধাতুশ্রমিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং সাও পাওলোর কাছে এক শিল্পতালুক শহরে একটি কারখানায় কাজ শুরু করেন। তবে সেখানে ১৯৬০-এর দশকে এক দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ-হাতের আঙুলটি বাদ যায়। তবে হাল ছাড়েননি ব্রাজিলের সেই লড়াকু ছেলে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। শুরুর দিকে রাজনীতির প্রতি লুলার তেমন খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে নিজের জীবন দিয়ে সবটা উপলব্ধি করেন এবং তারপরেই তিনি পুরোদমে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারপরেই লুলার জীবনে রাজনীতি এবং আন্দোলনের সূত্রপাত। সেই শুরু, তারপর ১৯৭৫ সালে, এক লক্ষ সদস্যবিশিষ্ট ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর, তিনি ব্রাজিলের শ্রমিক ইউনিয়ন আন্দোলনে এক আমূল পরিবর্তন আনেন। আগে যে সমস্ত সংগঠন মূলত, সরকারের অনুগত ছিল, সেগুলিকে তিনি একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন।
তারপর ১৯৮০ সালে, শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মী, বুদ্ধিজীবী, ট্রটস্কিবাদী এবং চার্চের কর্মীদের একত্রিত করে ‘ওয়ার্কার্স পার্টি’ (পিটি) গঠন করেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। যা ছিল সেই দেশের ইতিহাসে প্রথম বড় একটি সমাজতান্ত্রিক দল। পরবর্তীকালে ব্রাজিলের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনকে মাথায় রেখে যে বিপ্লবী অঙ্গীকার ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সরে গিয়ে একটি অধিকতর বাস্তববাদী এবং সামাজিক গণতান্ত্রিক অবস্থানে রূপ নেয়। আক্ষরিক অর্থেই দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি মানুষের কাছে তুলে ধরেন লুলা। আর সেই মানুষের ভোটেই তিনি ক্ষমতায় আসেন।
Minha vida é a prova de que o Brasil pode transformar sonhos em realidade. E a generosidade do povo brasileiro me dá ainda mais força para seguir trabalhando.
Vou dedicar cada dia, cada hora, cada minuto para construir o país que o nosso povo merece: um Brasil de paz, oportunidades, dignidade e esperança, onde todas as famílias possam dormir e acordar tranquilas.
— Lula (@LulaOficial) October 27, 2026
ক্ষমতায় আসার পর, একাধিক সামাজিক কর্মসূচিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন লুলা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অসমতা দূর করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ন্যূনতম মজুরি মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক বেশি বাড়িয়ে দেন এবং 'বলসা ফামিলিয়া' (Bolsa Família) নামক পারিবারিক অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তার পরিধি আরও প্রসারিত করেন ব্রাজিলের এই বামপন্থী প্রেসিডেন্ট। তার ফলে, প্রায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ উপকৃত হন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থন আরও জোরালো হয়। তাছাড়া লুলা জোর দিয়ে জানান, তিনি শেষপর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছেন। তাঁর যুক্তি হল, ব্রাজিলের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিতে অর্থায়নের জন্য তেল থেকে প্রাপ্ত আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাঁর সরকার আমাজনের জঙ্গলে বন উজাড়ের হার কমে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ডেটা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বন উজাড়ের পরিমাণ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। যা প্রমাণ করে দেয় যে, সরকারের গৃহীত নীতিগুলি সঠিকভাবেই কার্যকর হয়েছে। তার ফলাফল দেখা ফেল নির্বাচনেও।
এর আগে দুটি মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, আট বছর শেষে তিনি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন। লাতিন আমেরিকার বিদায়ী নেতাদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল নিঃসন্দেহে অভাবনীয়। প্রায় ৮৩%। তাঁর শাসনকালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রাজিলের ভাবমূর্তি অনেক বেশি উজ্জ্বল হয় এবং দেশটি গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রত্যক্ষ করে। তৃতীয় মেয়াদ শেষে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকায় লুলা প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এমনকি, জেলও খাটেন। শুধু তাই নয়, লড়াই করতে করতেই তাঁর জীবনে নেমে আসে মারণরোগ ক্যান্সার। সেটিকেও জয় করেন তিনি।
২০২৬ সালে এসে আবারও জয় করলেন। দেশের মানুষ তাঁকে জয়ী হিসেবে নির্বাচিত করলেন। অনেক ভিডিওতে দেখা গেছে, বহু মানুষ স্পিডবোটে করে ছুটে এসে ভোট দিচ্ছেন। সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি এশিয়ানেট নিউজ বাংলা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, ব্রাজিলের জনগণ উগ্র দক্ষিণপন্থী কোনও নেতাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে চায়নি। তাদের ভরসা ছিল বামপন্থার উপর। আর তাই লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকেই ফের একবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করল ব্রাজিলের জনগণ। যেখানে বলসোনারো সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে লুলা বলেছিলেন, “তিনি তো আর বিশ্বের সম্রাট নন।”
উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখানো সেই লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাই ফের একবার রাষ্ট্রনায়ক তথা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ৫১.৭৯%। জয়ের পর লুলা জানিয়েছেন, “আমরা মানুষকে বুঝিয়েছিলাম যে, আপনার ভোট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তারা উপলব্ধি করেছেন। কারণ, গণতন্ত্র রক্ষায় তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আসলে ব্রাজিল কারও বাড়ির উঠোন নয়। উগ্র ডানপন্থীদের মিথ্যাচার, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারসাজিকে পরাস্ত করে ব্রাজিলের মানুষ ইতিহাস রচনা করেছেন। ভবিষ্যৎ আজ থেকেই শুরু। তারুণ্যের ভবিষ্যৎ। দেশের মহিলা এবং বয়স্কদের বিশেষ ধন্যবাদ। যারা এই রায় দিয়েছেন।"
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।