
আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক স্তরে একটা বড়সড় অগ্রগতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ খুলতে একটি ৬০ দিনের অস্থায়ী সমঝোতাপত্রে (MoU) পৌঁছনো গিয়েছে বলে খবর। Axios-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, এই চুক্তি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকেও সবুজ সঙ্কেত আসা বাকি।
পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংকট মেটাতে দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্যই এই সমঝোতার প্রস্তাব। দু'পক্ষের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারেই চুক্তির বেশিরভাগ শর্তে দুই দেশই সহমত পোষণ করেছে। এখন শুধু শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদনের অপেক্ষা। এক মার্কিন আধিকারিক Axios-কে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চূড়ান্ত খসড়া খতিয়ে দেখতে কয়েক দিন সময় চেয়েছেন।
এই চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটাই হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। তবে আধিকারিকরা এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের পরমাণু সংক্রান্ত সব দাবি মেটাতে হলে আরও বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন হবে। এক মার্কিন আধিকারিক Axios-কে বলেন, "এই চুক্তির লক্ষ্য হল সবাইকে এক টেবিলে বসানো। আলোচনার সময়েই বাকি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো ঠিক করা হবে।" মার্কিন আধিকারিকরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারেই বেশিরভাগ শর্তে মতৈক্য হয়েছে, কিন্তু দু'পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদন বাকি ছিল। তাঁরা আরও দাবি করেন, ইরানের আধিকারিকরা পরে জানিয়েছেন যে তাঁরা প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়ে গিয়েছেন এবং চুক্তি সই করতে প্রস্তুত। যদিও তেহরান স্বাধীনভাবে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি।
মার্কিন আলোচকরা ট্রাম্পকে চূড়ান্ত খসড়া সম্পর্কে জানিয়েছেন, কিন্তু তিনি এখনও অনুমোদন দেননি। ওই মার্কিন আধিকারিক Axios-কে বলেন, "প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন যে তিনি এটা নিয়ে ভাবার জন্য কয়েক দিন সময় চান।" এই খবর এমন একটা সময়ে সামনে এল, যখন দু'পক্ষের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। CBS News-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বুধবার আমেরিকা ইরানের উপর হামলা চালায়। এক মার্কিন আধিকারিক এই হামলাকে "আত্মরক্ষামূলক" বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি রক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ।
CBS News জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী চারটি ইরানি ড্রোন গুলি করে নামায় এবং বন্দর আব্বাস শহরের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে হামলা চালায়। সেখান থেকে পঞ্চম ড্রোনটি ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল। ওই আধিকারিক আরও যোগ করেন যে, এই ঘটনার পরেও আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধবিরতি এখনও বজায় আছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই হামলার পর, ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) একটি আমেরিকান ঘাঁটিতে ভোরবেলা হামলা চালায়। তবে তারা ঘাঁটির নাম বা হামলার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
IRGC তাদের বিবৃতিতে জানায়, "আজ ভোরে বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের উপকণ্ঠে আক্রমণকারী আমেরিকান সেনাবাহিনীর আকাশপথে হামলার জবাবে, ভোর ৪:৫০ মিনিটে আগ্রাসনের উৎসস্থল ওই আমেরিকান বিমানঘাঁটিকে নিশানা করা হয়।" পরে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) নিশ্চিত করে যে ইরান কুয়েতের দিকে হামলা চালিয়েছিল, যা "কুয়েতি বাহিনী সফলভাবে প্রতিহত করে।"
Axios-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সমঝোতাপত্রে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল "অবাধ" থাকবে এবং ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালী থেকে সমস্ত মাইন সরাতে হবে। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার অনুপাতে আমেরিকাও নৌবাহিনীর উত্তেজনা কমাবে।
সমঝোতাপত্রে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। এছাড়াও, ৬০ দিনের প্রাথমিক আলোচনায় ইরানের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যকলাপ সীমিত করার উপর জোর দেওয়া হবে।
এর বিনিময়ে, আমেরিকা বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা করবে বলে Axios জানিয়েছে।
এই সমঝোতাপত্রে ইরানে মানবিক সাহায্য এবং পণ্য প্রবেশের সুবিধার্থে বিভিন্ন ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে। Axios এক মার্কিন আধিকারিকের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। তিনি বলেন, "ওদের প্রশাসনে এমন লোক আছেন যারা বোঝেন যে এটা অন্য পথে হাঁটার একটা সুযোগ। ৬০ দিনের আলোচনায় আমরা জানতে পারব সেটা সত্যি কি না।" আধিকারিকরা আরও স্পষ্ট করেছেন যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা আর্থিক লেনদেন নিয়ে কোনও গোপন চুক্তি বা ধারা থাকবে না। এক আধিকারিক বলেন, "ইরান যতটা ছাড়তে রাজি হবে, ততটাই তারা পাবে।"