জি৭ সম্মেলনে কি ম্যাক্রোঁ-ট্রাম্পের বৈঠক সত্যিই খুব কঠিন ছিল? গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের রহস্যময় মন্তব্যের আসল অর্থ কী? হট মাইকে ফাঁস হওয়া নেতাদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা কি ভবিষ্যতের কোনও বড় কূটনৈতিক চালের ইঙ্গিত দিচ্ছে? মেলোনি, জেলেনস্কি এবং অন্য নেতাদের এই সব কথাই বা কীসের সঙ্কেত?
G7 Summit Hot Mic: ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ-তে চলছিল G7-এর হাই-প্রোফাইল সম্মেলন। কড়া নিরাপত্তা আর চূড়ান্ত গোপনীয়তার মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব অর্থনীতির মতো গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে এসেছিলেন বিশ্বের তাবড় নেতারা। কিন্তু তাঁদের একেবারে ব্যক্তিগত মুহূর্তের কথাবার্তা রেকর্ড হয়ে গেল একটা চালু মাইক্রোফোনে, অর্থাৎ 'হট মাইক'-এ। এই ঘটনায় ফুটবল, ধূমপানের অভ্যাস, গোপন বৈঠক এমনকি 'গ্রিনল্যান্ড' নিয়েও নেতাদের অনেক গোপন কথা সারা বিশ্বের সামনে চলে এসেছে।

ম্যাক্রোঁর সেই গোপন স্বীকারোক্তি: "ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকটা খুব কঠিন ছিল"
এই ফাঁসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ হল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে একটি গোপন কথোপকথন। খুব নিচু গলায় ম্যাক্রোঁকে জেলেনস্কির কাছে বলতে শোনা যায় যে, আগের সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক "খুবই কঠিন" ছিল। এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুল্ক, ইরান বিতর্ক এবং বাণিজ্য নীতি নিয়ে ওয়াশিংটন এবং ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন ম্যাক্রোঁ জেলেনস্কিকে জিজ্ঞাসা করেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ঠিক হয়েছে কিনা। জেলেনস্কি 'না' বলার পর ম্যাক্রোঁ রহস্যময়ভাবে বলেন: "ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।"
মেলোনির সেই শপথ আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ফুটবলে 'অসাধারণ' প্রতিক্রিয়া
ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে সম্মেলনে কিছু হালকা মেজাজের কথাও রেকর্ড হয়েছে। মঙ্গলবার জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে মজার ছলে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি সকালে সিগারেট খেয়েছেন কিনা। উত্তরে মেলোনি হাত তুলে ঘোষণা করেন যে তিনি "১ মে-র পর থেকে" সিগারেট ছুঁয়েও দেখেননি। এই কথায় কানাডা, ব্রিটেন এবং জাপানের প্রতিনিধিরা তাঁকে অভিনন্দন জানান। এর মধ্যে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি রহস্য বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন: "আপনার কাছে কি নিকোটিন প্যাচ আছে?" এছাড়া, মধ্যাহ্নভোজের সময় নেতাদের মধ্যে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এবং ফুটবল নিয়েও জোর আলোচনা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ফুটবলের শক্তিশালী দল স্পেনকে ০-০ গোলে আটকে দেওয়ার জন্য কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের খুব প্রশংসা করেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেন, "বলতেই হবে, এটা অসাধারণ একটা ব্যাপার।"
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের রহস্যময় শব্দ এবং হোয়াইট হাউসের 'খাঁচার লড়াই'-এর সত্যিটা
হট মাইকের সবচেয়ে অবাক করা এবং বিভ্রান্তিকর মুহূর্তটি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তার কথোপকথন। মাইক্রোফোনে ট্রাম্পকে হঠাৎ খুব গম্ভীর গলায় কোস্তাকে বলতে শোনা যায়: "আপনি বুঝতে পারছেন?" এবং তারপর কিছুক্ষণ থেমে তিনি শুধু একটি শব্দ বলেন - "গ্রিনল্যান্ড।" যেহেতু এই কথোপকথনের শুরু বা শেষ রেকর্ড করা যায়নি, তাই ট্রাম্প কোন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ট্রাম্পের পুরনো মন্তব্যের জন্য ডেনমার্ক-সহ অনেক ইউরোপীয় দেশ আগেই তীব্র সমালোচনা করেছে। এর ঠিক পরেই, ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনা ঘুরিয়ে দিয়ে রবিবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত UFC (আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ) ইভেন্ট এবং খাঁচার ধারে বসে খেলা দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।
সাইকেল, ৪৭ নম্বর জার্সি এবং চ্যান্সেলরের শেষ গোপন বার্তা
এই শীর্ষ সম্মেলনে কূটনৈতিক উপহার বিনিময়ের বিষয়টিও সবার নজর কেড়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ আগামী বছরের 'সাইক্লিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ'-এর প্রচারের জন্য সমস্ত নেতাকে বিশেষভাবে তৈরি সাইকেল উপহার দেন। যদিও, শরীরচর্চা না করা এবং শুধু গল্ফ খেলতে পছন্দ করা ট্রাম্পের এই উপহার পেয়ে কী প্রতিক্রিয়া ছিল, তা মাইকে রেকর্ড হয়নি। সবচেয়ে মজার মুহূর্ত ছিল যখন জার্মান চ্যান্সেলর মার্জ ট্রাম্পকে জার্মানির জাতীয় ফুটবল দলের একটি জার্সি উপহার দেন, যেখানে ট্রাম্পের নাম এবং তাঁর প্রেসিডেন্ট নম্বর '৪৭' লেখা ছিল। ট্রাম্প হেসে সেই শার্টটি দেখান। পরে মার্জ সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ছবিটি শেয়ার করে একটি গভীর কৌশলগত বার্তা লেখেন - "শেষ পর্যন্ত, আমরা তো একই দলে।" এই হট-মাইক ফাঁস প্রমাণ করে দিয়েছে যে ক্যামেরার আড়ালেও বিশ্বের এই বড় বড় নেতাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর ভাগ্য নজর রাখছে।


