
মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ বা হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস রাশিয়ার সরকারি আধিকারিক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোকে নিশানা করে একটি কড়া নিষেধাজ্ঞার বিল পাশ করেছে। ইউক্রেনকে সমর্থন জোগানো এবং যুদ্ধ থামাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ বাড়ানোই এই বিলের মূল লক্ষ্য। প্রসঙ্গত, এই যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে পা দিয়েছে। বুধবার ২৬২-১৫৯ ভোটে বিলটি পাশ হয়। এবার এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
প্রয়াত রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান এবং ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ লিন্ডসে ও গ্রাহামের নামে এই বিলের নামকরণ করা হয়েছে। 'লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬' নামের এই বিলটি তৈরি করতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলেছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ইউক্রেনের সমর্থনে আমেরিকার অন্যতম বড় আইনি পদক্ষেপ এটি।
ডেমোক্র্যাট দলের মার্কিন কংগ্রেসম্যান স্টেনি হোয়ার জানিয়েছেন, এই বিল পাশ হওয়ার মানে হলো ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার প্রতি ওয়াশিংটন তাদের প্রতিশ্রুতি আরও একবার স্পষ্ট করল। বিলটি পাশ হওয়ার পর এক সাংবাদিক বৈঠকে হোয়ার বলেন, "স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং এমন একটি দেশের জন্য আজ একটা ভালো দিন, যারা একটি বর্বর দেশের দ্বারা আক্রান্ত। চুক্তি ভেঙে তারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব, ভূগোল এবং গণতন্ত্রকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতির বদলে সমস্ত পারমাণবিক উপাদান হাতিয়ে নিয়েছে।"
২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের সঙ্গে বর্তমান সংঘাতের তুলনা টেনে হোয়ার আরও বলেন, এই আইন ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের নতুন প্রতিশ্রুতিরই প্রমাণ। তিনি বলেন, "ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং ভূগোলকে সমর্থন করার যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম, আজ তা পূরণের দিকে এক ধাপ এগোলাম। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময় আমাদের নরম মনোভাবই এই যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল। আজ মার্কিন কংগ্রেস দলমত নির্বিশেষে স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, এসব আর মেনে নেওয়া হবে না। মার্কিন কংগ্রেসের মাধ্যমে আমেরিকার কণ্ঠস্বর আজ রাশিয়া এবং পুতিনকে বলছে, 'আর নয়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের আচরণের সাফাই গাওয়া আর চলবে না। রোজ রাতে ইউক্রেনীয়দের মরতে দেওয়া আর হবে না। পূর্ব ইউক্রেন এবং ক্রিমিয়া চুরি করা আর চলবে না। সমস্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে স্বাধীন দেশগুলোর ওপর এমন বর্বর আক্রমণ আর মেনে নেওয়া হবে না'।"
অন্যদিকে, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইকেল ম্যাককল এই বিলের পেছনে থাকা দুই দলের সমর্থন এবং মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টায় এর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। ম্যাককল বলেন, "আমি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাশ হয়েছে। এই বিল রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে পঙ্গু করে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত পুতিনকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করবে। শুধু রাশিয়া নয়, চিন এবং ইরানের মতো আমেরিকার শত্রুরাও যাতে তাদের আগ্রাসী প্রচারের জন্য ভুগতে বাধ্য হয়, এই বিল তা নিশ্চিত করবে।"
যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা নিয়ে গ্রাহামের একটি মন্তব্যের কথাও মনে করিয়ে দেন ম্যাককল। তিনি বলেন, "নিজের শেষ সাংবাদিক বৈঠকে লিন্ডসে বলেছিলেন, 'এই যুদ্ধ শেষ করার সূত্র আমাদের হাতে রয়েছে, এ নিয়ে আজকের মতো এতটা আশাবাদী আমি আগে কখনও ছিলাম না।' আমি তাঁর কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত।"
এই আইনে রুশ আধিকারিক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাঙ্কিং কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞার আওতা আরও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি, রাশিয়ার 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়াতরীর অংশ হিসেবে থাকা জাহাজগুলোকেও নিশানা করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে রাশিয়া এই জাহাজগুলো ব্যবহার করে আসছে বলে আমেরিকার দাবি।
এই বিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, রাশিয়ার পেট্রোলিয়াম বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনে এমন শীর্ষ পাঁচটি আমদানিকারক দেশের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে থাকবে। তবে যেসব দেশ রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই কেনাকাটা কমানোর জন্য বড়সড় পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে।
রাশিয়ার জ্বালানি কেনার বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে, ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর একটি আইনি রাস্তাও তৈরি করেছে এই বিল। তবে বিলটি সরাসরি ভারতীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপাচ্ছে না; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই ধরনের শুল্ক বসানোর ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে তুলে দিচ্ছে।
রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হলো ভারত এবং চিন। মস্কোর সঙ্গে তাদের এই ধারাবাহিক জ্বালানি বাণিজ্যই বিলের শুল্ক সংক্রান্ত শর্তগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বিলের সমর্থকদের যুক্তি, যেসব দেশ রাশিয়ার জ্বালানি কিনে মস্কোর আয় বাড়াতে সাহায্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইরানের ওপর থাকা বর্তমান নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর জন্য ট্রাম্প যে দাবি জানিয়েছিলেন, সেটাও এই বিলে রাখা হয়েছে। বিলটিতে প্রেসিডেন্টের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে এই শর্তটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।