
আমাদের ভারতে যেমন সংসদীয় গণতন্ত্র রয়েছে, আমেরিকায় কিন্তু তেমনটা নয়। সেখানে চলে প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা। আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকার মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত— শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ। শাসন বিভাগের মাথায় থাকেন প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। সরকারি নীতি কার্যকর করা এবং দেশ চালানোই এই বিভাগের কাজ। অন্যদিকে, আইন বিভাগকে বলা হয় কংগ্রেস।
কংগ্রেসের আবার দুটি কক্ষ রয়েছে— হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (প্রতিনিধি সভা) এবং সেনেট। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে মোট ৪৩৫ জন সদস্য থাকেন। সাধারণ মানুষ সরাসরি তাঁদের ভোট দিয়ে জেতান। প্রতি দু'বছর অন্তর এই নির্বাচন হয়। রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে এই সভার আসন ঠিক হয়। যে কারণে ক্যালিফোর্নিয়া বা টেক্সাসের মতো বড় রাজ্যগুলোতে আসন সংখ্যা বেশি। আর সেনেটে মোট ১০০ জন সদস্য থাকেন। আমেরিকার প্রতিটি রাজ্য থেকে দু'জন করে সেনেটর নির্বাচিত হন। এঁদের মেয়াদ ছ'বছর। প্রতি দু'বছর অন্তর সেনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।
তৃতীয় বিভাগ অর্থাৎ বিচার ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট এবং অন্যান্য ফেডারেল কোর্ট। আমেরিকায় নতুন কোনও আইন আনতে হলে প্রথমে কংগ্রেসের দুটি কক্ষেই তা পাশ করাতে হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট সই করলে তবেই সেটি আইনে পরিণত হয়। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা থাকে না। কংগ্রেস এবং বিচার ব্যবস্থাও সরকারের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। এই মেয়াদের ঠিক মাঝপথে, অর্থাৎ দু'বছর পূর্ণ হওয়ার পর যে নির্বাচন হয়, তাকেই মিডটার্ম নির্বাচন বলে। এটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হলেও, দেশের রাজনীতিতে এর গুরুত্ব মারাত্মক। এই নির্বাচনে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের পুরো ৪৩৫টি আসনেই ভোট হয়। আর সেনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে প্রায় ৩৩ বা ৩৪টি আসনে নির্বাচন হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে গভর্নর পদ এবং স্থানীয় প্রশাসনের আসনগুলোতেও ভোট নেওয়া হয়।
আমেরিকায় মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল রয়েছে— রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটিক। মূল নির্বাচনের আগে এই দলগুলো রাজ্য স্তরে প্রাইমারি বা ককাস করে নিজেদের প্রার্থী বেছে নেয়। এরপর সাধারণ নির্বাচনে মানুষ তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। যিনি সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই জেতেন। আমেরিকায় ভোট পরিচালনার দায়িত্ব মূলত রাজ্য এবং স্থানীয় আধিকারিকদের হাতে থাকে। তাই রাজ্যভেদে ভোটার নিবন্ধনের নিয়ম এবং ভোট দেওয়ার পদ্ধতি আলাদা হয়। পোস্টাল ব্যালট, আগাম ভোট বা নির্বাচনের দিন সরাসরি ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে। স্থানীয়, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরের নির্বাচন একসঙ্গে হওয়ায় এলাকা অনুযায়ী ভোটারদের আলাদা আলাদা ব্যালট দেওয়া হয়। এই কারণেই চূড়ান্ত ফলাফল আসতে বেশ কয়েকদিন সময় লেগে যেতে পারে।
বর্তমানে মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকান দলের সামান্য আধিপত্য রয়েছে। সেনেটে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ৫৩টি আসন, আর ডেমোক্র্যাটদের হাতে ৪৭টি। সেনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত আরও চারটি আসন জিততে হবে। এই লড়াইয়ে টেক্সাস, মেইন, ওহাইও এবং আলাস্কার মতো রাজ্যগুলো নির্ণায়ক হতে চলেছে। অন্যদিকে, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসেও রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব সামান্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা এবার এই সভার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে।
সাধারণত আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্টের দল ধাক্কা খায়। গত ২৩টি মিডটার্ম নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, প্রেসিডেন্টের দল গড়ে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ২৭টি এবং সেনেটে ৩টি আসন হারিয়েছে। সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং খারাপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই এর মূল কারণ।
২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কিছু বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সরকারি খরচ কমানোর লক্ষ্যে 'ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি' (DOGE)-এর মাধ্যমে তিনি ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই করেছেন। হিসেব বলছে, প্রায় ২.৬৪ লক্ষ সরকারি চাকরি কমেছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এবং জ্বালানির খরচ আমেরিকানদের চিন্তায় ফেলেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহণে বাধা আমেরিকার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্পের চাপানো আমদানি শুল্ক এবং চিনের ওপর বিপুল ট্যারিফ নিয়েও জোর চর্চা চলছে। এই সব ক'টি বিষয়ই নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।
মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকান দল যদি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প খুব সহজেই নিজের নীতিগুলো কার্যকর করতে পারবেন। নতুন আইন তৈরি বা বাজেট পাসের মতো বিষয়গুলোতে তিনি সরকারের পূর্ণ সমর্থন পাবেন। কিন্তু ডেমোক্র্যাটিক দল যদি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের দখল নেয়, তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যাবে। ট্রাম্প সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে তখন তারা কড়া প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারবে। বিশেষ করে বাণিজ্য শুল্ক, বিদেশ নীতি, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত এবং সরকারি খরচের ওপর তারা তদন্ত শুরু করতে পারে। এর ফলে ট্রাম্প সরকারকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড়সড় বাধার মুখে পড়তে হবে।
শুধু তাই নয়, হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষমতাও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে আসবে। তবে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব পাশ হওয়া আর প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানো— দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস ইমপিচমেন্টে সায় দিলেও, সেনেটে তার বিচার হতে হবে। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে হলে সেনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। তাই এই নির্বাচনে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা ট্রাম্পের বাকি দু'বছরের মেয়াদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের ফলাফল ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত আমেরিকার সরকারি নীতিগুলোকে প্রভাবিত করবে।
আমেরিকা বাণিজ্য, বিদেশ নীতি বা প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তার প্রভাব ভারতের ওপর পড়ে। বিশেষ করে আইটি চাকরি, এইচ-১বি (H-1B) ভিসা, আমদানি শুল্ক এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকায় এইচ-১বি ভিসার ওপর ট্রাম্প সরকার কড়া নিয়ম চালু করেছে। নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে বিপুল ফি চাপানোয় ভারতীয় পেশাদার এবং আইটি কোম্পানিগুলো সমস্যায় পড়েছে। আমেরিকায় এইচ-১বি ভিসা প্রাপকদের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি ভারতীয়। তাই এই সিদ্ধান্তগুলো আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত চিন্তার। আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভরশীল ভারতীয় আইটি সেক্টরের কাছেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনায়, ২০২৫ সালে ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপিয়েছিল। পরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পর ২০২৬ সালে তা সাময়িকভাবে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে এই বিষয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক আলোচনা এবং পারস্পরিক স্বার্থই শেষ কথা বলবে। অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক মজবুত হচ্ছে। সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে চিনের আধিপত্য খর্ব করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির বিকাশে 'ট্রাস্ট' (TRUST - Transforming Relationship Utilizing Strategic Technology) নামের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের দখল নেয়, তবে ট্রাম্প সরকারের চাপানো আমদানি শুল্ক এবং বিদেশ নীতির ওপর কড়া নজরদারি শুরু হতে পারে। এতে ভারতীয় রফতানিকারকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে আমেরিকার রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতিতে দুই দলেরই সমর্থন থাকায়, শুল্কের ক্ষেত্রে রাতারাতি বড় কোনও পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।