
বিদেশ ভ্রমণ মানেই লাখ লাখ টাকার ধাক্কা, এমনটাই ভাবেন অনেকে। বিমানভাড়া, হোটেল, খাওয়া আর ঘোরার খরচ মিলিয়ে বাজেট আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। কিন্তু ঠিকঠাক প্ল্যান করলে কম খরচেও বিদেশ ঘোরা সম্ভব। ভিয়েতনাম তেমনই একটা দেশ। পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহাসিক জায়গা আর দারুণ সব খাবারের টানে এখানে পর্যটকরা ভিড় জমান। ভারতীয়দের কাছেও ভিয়েতনাম এখন হট ফেভারিট। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এখানকার মুদ্রার মান। ভারতীয় ১০০ টাকা ভিয়েতনামের মুদ্রায় (ভিয়েতনামিজ ডং বা VND) প্রায় ৩০,০০০ টাকার সমান! এই দেশে হোটেল, খাওয়া আর যাতায়াতে কত খরচ হয়? যাওয়ার আগে কী কী জানা দরকার? চলুন, সবটা জেনে নিই।
ভিয়েতনামের সরকারি মুদ্রার নাম ভিয়েতনামিজ ডং। ভারতীয় টাকাকে যেমন INR বলা হয়, তেমনই একে VND বলা হয়। এই দেশে গেলে হাজার বা লাখের অঙ্কে দাম দেখে নতুনরা চমকে যেতে পারেন।
ভিয়েতনামে ১০০ টাকার বদলে প্রায় ৩০,০০০ ডং এবং ১,০০০ টাকার বদলে প্রায় ৩ লাখ ডং পাওয়া যায়। তবে ব্যাঙ্ক বা কারেন্সি এক্সচেঞ্জের ওপর নির্ভর করে এই রেট কিছুটা বদলাতে পারে।
দোকানে বড় বড় সংখ্যা দেখে ভাববেন না জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি। ডং-এর মান কম বলেই সংখ্যাগুলো বড় দেখায়। ভারতীয় টাকায় হিসেব করলেই আসল দামটা বুঝতে পারবেন।
শুধু মুদ্রার মান দেখে কোনও দেশ সস্তা কি না, তা বলা যায় না। হোটেল, খাওয়া, যাতায়াত আর ঘোরার জায়গার টিকিটের দামও মাথায় রাখতে হবে। লোকাল রেস্তোরাঁয় খাওয়া আর পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করলে খরচ অনেকটাই কমানো যায়। তবে বিলাসবহুল রিসর্ট বা প্রাইভেট ক্যাব নিলে বাজেট হু হু করে বাড়বে। তাই ভিয়েতনাম খুব সস্তাও নয়, আবার খুব দামিও নয়।
ভিয়েতনামে দেখার মতো অনেক জায়গা রয়েছে। সময় আর বাজেটের ওপর ভিত্তি করে আপনি প্ল্যান সাজাতে পারেন।
১. হা লং বে (Ha Long Bay): সমুদ্রের মাঝে চুনাপাথরের পাহাড় আর সবুজ দ্বীপ নিয়ে তৈরি এই জায়গাটি পর্যটকদের দারুণ পছন্দের। এখানে ক্রুজ ট্যুর আর গুহা দেখার সুযোগ রয়েছে।
২. হ্যানয় (Hanoi): ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় তার ইতিহাস আর সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। হো চি মিন সমাধিক্ষেত্র, হোয়ান কিম লেক আর ওল্ড কোয়ার্টার এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
৩. হো চি মিন সিটি (Ho Chi Minh City): আগে এর নাম ছিল সায়গন। ওয়ার রেমন্যান্টস মিউজিয়াম, নটরডেম ক্যাথেড্রাল, সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস আর বেন থান মার্কেট এখানে ঘুরে দেখতে পারেন।
৪. দা নাং (Da Nang): সমুদ্রসৈকত আর আধুনিক শহরের মিশেল এই দা নাং। মাই খে বিচ, মার্বেল মাউন্টেনস আর বা না হিলস এখানকার মূল আকর্ষণ। বা না হিলসের গোল্ডেন ব্রিজ পর্যটকদের নজর কাড়ে।
৫. হোই আন (Hoi An): রঙিন লণ্ঠন আর পুরনো স্থাপত্যের জন্য এই শহর বিখ্যাত। সন্ধেবেলা পুরনো রাস্তায় হাঁটা বা নদীতে নৌকাবিহার দারুণ অভিজ্ঞতা দেয়।
৬. নিন বিন (Ninh Binh): সবুজ ধানের খেত আর চুনাপাথরের পাহাড় ঘেরা এই জায়গাটি প্রকৃতির মাঝে শান্তিতে সময় কাটানোর জন্য সেরা। এখানে ট্রাং আন এবং তাম কক-এ নৌকাবিহার করতে পারেন।
৭. ফু কুওক (Phu Quoc): নীল জল আর সুন্দর রিসর্টের জন্য এই দ্বীপটি বিখ্যাত। রিল্যাক্স করার জন্য এটা দারুণ জায়গা।
ভিয়েতনাম ট্যুর আরামদায়ক করতে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
ভিসা: ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের যাওয়ার আগেই ভিয়েতনামের ভিসার নিয়মকানুন জেনে নেওয়া উচিত। সরকারি ওয়েবসাইট থেকে ই-ভিসার বিস্তারিত তথ্য চেক করে নিন।
কারেন্সি এক্সচেঞ্জ: ভারত থেকে বেরোনোর আগে বা ভিয়েতনামে পৌঁছে নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে টাকা ভাঙিয়ে নিন। এয়ারপোর্টের চেয়ে শহরের এক্সচেঞ্জ রেট আলাদা হতে পারে।
বুকিং: ফ্লাইট, হোটেল আর ক্রুজ আগে থেকে বুক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। শেষ মুহূর্তে বুকিং করলে খরচ অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া: ভিয়েতনামের উত্তর, মধ্য আর দক্ষিণ দিকের আবহাওয়া একরকম নয়। যাওয়ার আগে ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে সেই অনুযায়ী জামাকাপড় গুছিয়ে নিন।
খাবার: ভিয়েতনামের খাবারে নুডলস, ভাত আর মাংসের চল বেশি। নিরামিষাশীদের আগে থেকে নিজেদের পছন্দের কথা জানিয়ে দেওয়া ভালো। বড় শহরগুলোতে ভারতীয় রেস্তোরাঁও পেয়ে যাবেন।
রোজ রোজ শহর না বদলে একটা জায়গায় দু-তিন দিন কাটানো ভালো। যেমন, হ্যানয়তে থেকে নিন বিন আর হা লং বে ঘুরে নিতে পারেন। আবার দা নাং আর হোই আন একসঙ্গে ঘোরা যায়।
যাওয়ার আগে প্রতিদিনের খরচের একটা লিমিট ঠিক করে নিন। হোটেল বুকিংয়ের সময় ট্যাক্স আর লোকাল যাতায়াতের খরচটা মাথায় রাখবেন। ক্যাশ আর কার্ড, দুটোই সঙ্গে রাখা জরুরি।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস আর দারুণ সব খাবারের স্বাদ একসঙ্গে পেতে ভিয়েতনাম সেরা জায়গা। ভারতীয় টাকার তুলনায় ভিয়েতনামিজ ডং-এর মান কম হওয়ায়, দামগুলো বড় দেখালেও টাকায় হিসেব করলে বাজেট বোঝা সহজ হয়।
তবে শুধু মুদ্রার মান কম হলেই ট্যুর সস্তা হয় না। ফ্লাইট, হোটেল আর ঘোরার খরচ মিলিয়ে বাজেট তৈরি করুন। ঠিকঠাক প্ল্যান করলে পকেটের ওপর চাপ না ফেলেই ভিয়েতনাম থেকে দারুণ সব স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারবেন।