
'দেখুন হয়তো খদ্দেরদের সঙ্গে দর কষাকষি ঠিক হয়নি। ওদের আবার ধ*র্ষ*ণ হয় নাকি!'
'আমি তো শুনেছি মেয়েটার অ্যাফেয়ার ছিল। ও নাকি পেগনেন্ট (গর্ভবতী) ছিল। পুলিশকে বলব ঠিক করে দেখতে।'
'একটা ছোট্ট ঘটনা। এরকম অনেক হয়।'
'শরীর থাকলে যেমন জ্বর হয়, তেমন একটু আধটু ধ*র্ষ*ণও হয়।'
'ওর বাবা-মাকে তো ১০ লাখ অফার করেছিলাম।'
'মেয়েরা রাত ৮টার পর বেরবে কেন? না বেরলে তো আর এই ঘটনা ঘটত না।'
অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া শরীরের অংশ সহজে আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেন না। কেন জানেন? কারণ অ্যাসিড সেখানকার কোষগুলোকেই চিরকালের মতো মেরে ফেলে। নতুন টিশ্যু, কোষ তৈরিই হয় না। উপরের কথাগুলি বিগত জমানায় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে বার বার উচ্চারিত হয়েছে। আরও আছে। অনেক অনেক আছে। কিন্তু উপস্থিত এটুকুই মনে পড়ছে। আসলে বয়স হয়েছে। অর্ধেকের বেশি চুল পেকে গেছে। কিন্তু উপরের এই কথাগুলি অ্যাসিডের ছাপ মেরে গেছে মনে। কামদুনি, পার্ক স্ট্রিট, হাঁসখালি, আর জি কর, দুর্গাপুর... তালিকায় আরও অনেক কিছু বাদ পড়ে গেল। তা যাক। এই বা কম কী! অ্যাসিড এখানে তো কম পড়েনি।
আমি দুর্নীতি, চুরি সব কিছু পাশে রেখেই এই লেখায় হাত দিয়েছি। ওগুলো অন্যতম ফ্যাক্টর ছিলই এই হারের পিছনে। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের যখন এই রকম অপমানের সম্মুখীন হতে হয়, যখন লোয়ার কোর্টে ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের ৩৪ বার সরকারি কৌঁসুলি বদলে উচ্চতর আদালতে অনেকে বেকসুর খালাস করানো হয়, যখন ধ*র্ষি*তা মেয়েদের ইজ্জতের দাম ধার্য হয় ১০ লাখ, যখন ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখার পর হাসপাতাল থেকে আত্মহত্যার খবর ছড়ানো হয়, যখন চিতায় অগ্নিসংযোগ করার আগে মেয়েটাকে শেষ দেখা পর্যন্ত দেখতে পান না বাবা-মা, যখন বন্ধুর ধ*র্ষ*ণের বিরুদ্ধে মুখ খুলে ১৫ বছর তৃণমূলের গুন্ডাদের হুমকি অত্যাচার সহ্য করে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়, কেমন লাগে বলুন তো?
এরা বাঙালি অস্মিতার কথা বলত। বাঙালি মাতৃ উপাসক। দুর্গা, কালী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, শীতলা, জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী পুজো করে জীবন পাত করেছে। এখনও করে। শিক্ষাঙ্গনে সরস্বতী পুজো হবে এটাই চিরকাল দেখে এসেছি। সেই পুজো করতে গিয়ে হুমকি এবং রে*প থ্রেট পেতে হয়েছে ছাত্রীদের এটাও দেখলাম। প্রিজন ভ্যানে অপরাধীদের জায়গা হয়। তাদের স্থানান্তর করা থেকে গ্রেফতারের পর জেলে নিয়ে যাওয়া সবই এর মাধ্যমে হয়। গত শাসক দলের এক বিধায়ক এর অন্দরসজ্জা ভালোই জানবেন। তিনি দীর্ঘদিন এতে যাতায়াত করেছেন। পুলিশ সেই ভ্যানের দেয়ালে তাক ধিনা ধিন তাল তুলে তার গানের স্বরও চাপা দিয়েছে। তাতে হঠাৎ করে ভাঙাচোড়া কালীমূর্তি তুলে পুলিশকে পালাতেও দেখলাম।
দেখতাম আর একটা গানের লাইন মনে আসত, 'এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার...' এ কেমন পরিবর্তন? মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এ রকম কথা বলতেই বা পারেন কীভাবে? তার পর তাঁর প্রিয় 'শাজানভাই' ওরফে শেখ শাহজাহানের সন্দেশখালি মডেল, দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ডায়মন্ড হারবার মডেল' এমন অনেক মডেল দেখলাম। পুলিশের সামনে গটগট করে হেঁটে ভিক্ট্রি সাইন দেখিয়ে থানায় ঢুকে যাওয়া সেই প্রিয় দামাল ছেলের কাণ্ড দেখে তো আপ্লুত হতেও দেখেছি কত প্রাক্তন শাসক দলের সমর্থককে। 'দেখলি লোকটার দাপট। উফ্... একে বলে ক্ষমতা। পুলিশকে একেবারে ছুঁচো বানিয়ে দিল।' ফুল মার্কস। বগটুইও মনে আছে। পুলিশ কেমন সুন্দর শর্ট সার্কিটের কারণ দেখিয়ে একটা গোটা পরিবারের হত্যাকাণ্ড দেখেও দেখেনি।
পুলিশ অবশ্য অনেক কিছুই দেখে না। সব দেখলে পুলিশের উর্দি পরাটাও দুষ্কর হয়ে উঠবে। আপনাদের বাধ্যবাধকতাও বুঝি। পরিবার তো আপনাদেরও আছে। যেমন কলকাতার বিশেষ কিছু অঞ্চলে এবং রাস্তায় হেলমেট না পরে বা ট্রাফিক আইনের কোনও তোয়াক্কা না করে বাইক চালানো যায়, সেটা পুলিশ দেখতে পায় না। বাকি এলাকায় সাধারণের প্রাণহানি নিয়ে ভয়ানক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে কেস দিতে দেখা যায়। বর্ষায় চাকা স্কিড করে আধফুট স্টপ লাইন পার করে এগিয়ে গেলেও ভয়ানক অপরাধ হয়, তার চালানও আসে। তবে আইন তো আইনই। কিন্তু সবার জন্য কেন এক নয়, সেটা ভেবে পাই না। এই যেমন আপনাদে মা-বোন-স্ত্রীকে অকথ্য গালিগালাজ করা 'বাঘের বাচ্চা'কে চিড়িয়াখানায় ঢোকাতে, বা নিদেনপক্ষে তার বিরুদ্ধে একটা এফ আই আর করতেও জামা-কাপড় নোংরা হয়ে যায়। এ জিনিসও বছরের পর বছর দেখেছি।
শিক্ষিত বেকারদের রাস্তায় দিনের পর দিন বসে রোদ-জল উপেক্ষা করে হকের চাকরির জন্য আন্দোলন করতে দেখেছি। আন্দোলনরত মহিলার গর্ভপাতও দেখেছি। বাড়িতে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তাদের শেষকৃত্য করে ফের আন্দোলনে যোগ দিতে দেখেছি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বীর পুঙ্গব পুলিশকে লাথি-লাঠি চালাতে দেখেছি। দিনের পর দিন দেখেছি। বছরের পর বছর দেখেছি। মন্ত্রীর বান্ধবীর খাটের তলা আর আলমারি থেকে সোনার খনি আর টাকার বান্ডিলের ছড়াছড়ি দেখেছি। দুষ্টু খেলনা দেখেছি। চাল, বালি, কয়লা, গরু আরও যেন কী কী সব পাচার মামলায় একের পর এক মন্ত্রী-সান্ত্রীদের জেলযাত্রাও দেখেছি।
সঅঅঅঅঅঅব দেখেছি। কিন্তু ওই কথাগুলো অ্যাসিডে পোড়ার ছাপ মেরে গেছে। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছি। কতবার ভেবেছি ওরা আমার বোন, আমার আত্মীয়, আমার মেয়ে। ওরা কাঁদছে। ওরা পুড়ে যাচ্ছে। ভয়ংকর চিৎকার করছে। ওদের গলা কেমন শক্ত করে টিপে ধরে রেখেছে। শ্বাস নিতে পারছে না। হাড় ভেঙে দিয়েছে। দম বন্ধ হয়ে যেত। তখন মনে মনে নিজেই অ্যাসিডে পোড়া জায়গায় হাত বুলিয়ে দেখতাম। নাহ্, একটুও শুকোয়নি। পচে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। এর ওষুধ নেই। মলম নেই। চিকিৎসা নেই।
ভোটের পর পর কয়েক দিন কী বৃষ্টিটাই না হল। এপ্রিলের শেষে কলকাতায় কেমন মাংসপোড়া গরম থাকে তা আর আলাদা করে বলে দিতে হবে না নিশ্চয়ই। কোথায় গরম! রাতে ফ্যান পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কেন জানি না, মনের মধ্যে কে যেন বলছিল, পাপ ধুয়ে যাচ্ছে। একদিনের প্রবল বৃষ্টিতে হবে না। তাই কয়েক দিন ধরে জল ঢেলে ধুয়ে দিচ্ছে মেয়েগুলো। ওদের কাছে তো জলের অভাব নেই। ছাই, হাড় যখন জাহ্নবীতে ভাসানো হয়েছে তখন থেকেই ওদের কাছে জলের অভাব নেই। ওরাই কলসি কলসি গঙ্গাজল ঢেলেছে। ডুবিয়ে দিয়েছে। সব ডুবিয়ে দিয়েছে। মডেল, আইন, ধর্ষণ, মন্তব্য, পাপ - সব ধুয়ে দিয়েছে। অ্যাসিডে পোড়া দগদগে জায়গাটা একটু হলেও সে দিন আরাম পাবে, যে দিন ওদের মধ্যে অন্তত একজন বিচার পাবে। ন্যায্য বিচার।
ওরা গেছে। আর ফিরবে না। কিন্তু সময় লাগলেও এই সিস্টেম, এই পাপ, এই কালো সাম্রাজ্যকে ধুয়ে দিয়ে গেল।