Durga Puja Special: জমিদার বাড়ির দালান থেকে বিশ্বমঞ্চে, বাংলার দুর্গাপূজার বিবর্তনের ইতিহাস

Published : Sep 02, 2026, 10:10 PM IST
Durga Puja Special

সংক্ষিপ্ত

Durga Puja Special: বাংলার দুর্গাপূজার ঐতিহাসিক বিবর্তন। জমিদার বাড়ির অভিজাত পুজো থেকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বারোয়ারি পুজোর জন্ম, স্বাধীনতা সংগ্রামে এর ভূমিকা এবং আধুনিক থিম পুজোর নান্দনিকতা থেকে শুরু করে ইউনেস্কোর বিশ্ব স্বীকৃতি পর্যন্ত এর সম্পূর্ণ যাত্রাপথ এখানে বর্ণিত হয়েছে।

সূচনাকাল ও জমিদার বাড়ির বনেদি পুজো-

পুরাণ মতে বসন্তকালে দেবী দুর্গার আরাধনা বা বাসন্তী পূজার প্রচলন থাকলেও, ত্রেতাযুগে শ্রী রামচন্দ্র রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শরৎকালে দেবীর অকাল বোধন করেছিলেন। তবে বাংলায় পারিবারিক বা সামাজিক আকারে শারদীয়া দুর্গাপূজার সূত্রপাত ঘটে মধ্যযুগে।

বঙ্গে প্রথম পুজো: ইতিহাসবিদদের মতে, তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে প্রথম বড় আকারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার বড়িশার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবারে পুজো শুরু হয়। পরবর্তীতে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেবের হাত ধরে ব্রিটিশ আমলে বাবু সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে জমিদার বাড়ির পুজো এক বিশাল প্রতিপত্তি ও আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই পুজো ছিল মূলত সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এবং ধনীদের বৈঠকখানার বিনোদন।

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দুর্গাপুজো

নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের (১৭১০–১৭৭৩) হাত ধরে বাংলার দুর্গাপুজো এক নতুন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রা পেয়েছিল। তাঁর আমলেই মূলত দুর্গাপুজো জমিদারি বা বনেদি বাড়ির উৎসব থেকে ধীরে ধীরে জনসাধারণের উৎসব বা বারোয়ারি পুজোর রূপ নিতে শুরু করে। রাজবাড়ির পুজো ও 'রাজরাজেশ্বরী' রূপরাজা কৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন।

দেবী দুর্গার বিশেষ মূর্তি-

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দেবী দুর্গা সাধারণ মূর্তির চেয়ে কিছুটা আলাদা। এখানে দেবীকে 'রাজরাজেশ্বরী' রূপে পুজো করা হয়। এই প্রতিমায় সিংহের মুখটি সাধারণ সিংহের মতো নয়, বরং পৌরাণিক 'ঘোটক মুখী' বা ঘোড়ার মতো দেখতে সিংহের রূপ দেওয়া হয়।ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধরীতি: দেবীর ডান পাশে জয়া এবং বাম পাশে বিজয়া নামের দুই সখী থাকেন। প্রাচীন রীতি মেনে আজও অষ্টমীর দিন তোপ দেগে ও বন্দুকের গুলি ছুড়ে সন্ধিপুজো শুরু করার প্রথা রয়েছে।

দুর্গাপুজোর ব্যাপক প্রচলন

বাংলায় দুর্গাপুজো জনপ্রিয় করার কারিগর১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় যখন চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর রাজ্যের অন্তর্গত বহু জমিদার ও ভূস্বামীদের দুর্গাপুজো করার জন্য বিপুল অর্থ সাহায্য এবং উৎসাহ দিতে শুরু করেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলেই তৎকালীন নদীয়া ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে ঘরে ঘরে দুর্গাপুজোর ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়।

জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা ও দুর্গাপুজোর সংযোগ

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে বাংলায় জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক লোকগাথা প্রচলিত আছে:নবাবের বন্দিদশা: একবার দুর্গাপুজোর ঠিক আগে আলিবর্দি খাঁ বা তৎকালীন নবাবের রাজকর দিতে না পারায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দি করা হয়েছিল। যখন তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নদীপথে কৃষ্ণনগরে ফিরছিলেন, তখন বিজয়া দশমীর বিসর্জনের বাজনা বাজছিল। সেই বছর দুর্গাপুজো করতে না পারায় রাজা অত্যন্ত ভেঙে পড়েন।লোকশ্রুতি অনুযায়ী, সেই রাতেই দেবী দুর্গা তাঁকে জগদ্ধাত্রী রূপে স্বপ্নাদেশ দেন এবং কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে পুজো করতে বলেন। এর পরপরই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণনগরে এবং তাঁর দেওয়ান দাতারাম ঘোষ চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা করেন, যা আসলে দুর্গাপুজো করতে না পারার দুঃখ থেকেই জন্ম নিয়েছিল।

সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ও অন্নদামঙ্গল কাব্যরাজা কৃষ্ণচন্দ্র কেবল পুজো করেননি, বরং পুজোকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রাজসভার কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে দিয়ে তিনি 'অন্নদামঙ্গল কাব্য' রচনা করিয়েছিলেন, যেখানে দেবী দুর্গা ও অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য কীর্তন করা হয়েছে। এছাড়া তাঁর সভার রসিক বিদূষক গোপাল ভাঁড়কে কেন্দ্র করে বহু পুজো ও উৎসবের গল্প আজও বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত।

বারোয়ারি পূজার উৎপত্তি-

বারোয়ারি পূজার উৎপত্তি ও গণতন্ত্রীকরণ জমিদারদের এই একচেটিয়া আভিজাত্যে আঘাত হেনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় 'বারোয়ারি' পুজো। ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় এক জমিদার বাড়ির পুজোয় বারো জন ব্রাহ্মণ বন্ধুকে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। অপমানিত হয়ে তাঁরা সাধারণ মানুষের থেকে চাঁদা বা অনুদান সংগ্রহ করে নিজেদের পুজো শুরু করেন। এটিই ছিল বাংলার প্রথম বারোয়ারি পুজো (যদিও তা ছিল প্রধানত জগদ্ধাত্রী পুজো)।

নেতাজির দুর্গাপুজো-

কলকাতার দুর্গাপুজোকে বারোয়ারি বা সর্বজনীন রূপ দেওয়ার পেছনে নেতাজির বিরাট ভূমিকা ছিল। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি কলকাতার বিখ্যাত বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটির সভাপতি মনোনীত হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শে নেতাজি উদ্যোগ নেন যাতে দুর্গাপুজো কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তিনি এই উৎসবে সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণি এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল উৎসবের মঞ্চকে ব্যবহার করে দেশের সকল ধর্মের মানুষকে এক ছাতার তলায় এনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা।

কুমোরটুলির সঙ্গে সংযোগ: কলকাতার কুমোরটুলির ঐতিহ্যবাহী পুজো ও প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গেও তাঁর বিশেষ আত্মিক যোগাযোগ ছিল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক ছিল। তিনি দুর্গাপুজোকে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে পরাধীন ভারতের বুকে ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সর্বজনীন সম্প্রীতির এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

কলকাতার প্রথম সর্বজনীন বারোয়ারি দুর্গাপূজা

কলকাতায় আগমন- ১৯ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় এই ধারার প্রবেশ ঘটে এবং ১৯১০ সালে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার হাত ধরে কলকাতার বাগবাজারে প্রথম সর্বজনীন বারোয়ারি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে পুজো আর কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি রইল না, তা হয়ে উঠল 'সব মানুষের' বা সর্বজনীন। স্বাধীনতার আন্দোলন ও দুর্গাপূজাবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে দুর্গাপূজা একাত্ম হয়ে যায়। ব্রিটিশ বিরোধী চেতনা জাগ্রত করতে বারোয়ারি মণ্ডপগুলোকে ব্যবহার করা শুরু হয়। স্বদেশী আন্দোলনের সময় মণ্ডপে লাঠিখেলা, কুস্তি ও শারীরিক কসরতের প্রদর্শনী হতো। দেবী দুর্গাকে তখন কেবল ধর্মীয় দেবী হিসেবে নয়, বরং অত্যাচারী ব্রিটিশ শক্তির বিনাশের জন্য 'ভারত মাতা' বা শক্তির উৎস হিসেবে আবাহন করা হতো।

আধুনিক যুগের থিম পুজো-

আধুনিক যুগের থিম পুজো ও নান্দনিক বিবর্তন একবিংশ শতাব্দীতে এসে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এক অভূতপূর্ব বাঁক নেয়। ঐতিহ্যবাহী 'একচালার প্রতিমা' ও সাধারণ ডেকোরেটরদের প্যান্ডেল বদলে যেতে শুরু করে নব্বইয়ের দশক থেকে। জন্ম নেয় 'থিম পুজো'-র ধারণা। বর্তমানের বারোয়ারি পুজো কোনও সাধারণ ধর্মীয় মণ্ডপ নয়, এটি একটি উন্মুক্ত শিল্প প্রদর্শনী (Public Art Exhibition)। বিশিষ্ট চারুশিল্পী ও ভাস্করদের ছোঁয়ায় মণ্ডপগুলো হয়ে ওঠে চলমান জাদুঘর। গ্রামীণ বাংলার লুপ্তপ্রায় কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে বিশ্বের বিখ্যাত স্থাপত্য, কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতার মতো জটিল বিষয়গুলো আজ মণ্ডপ ও প্রতিমা শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি: সর্বজনীন থেকে বিশ্বজনীনবাংলার এই বারোয়ারি উৎসব আজ আর কোনও ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে এটি আজ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক মহামিলন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপূজাকে ইউনেস্কো (UNESCO) তাদের 'Intangible Cultural Heritage of Humanity' বা মানবতার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এক আন্তর্জাতিক অনন্য সম্মান প্রদান করেছে।

দালান কোঠার এক কোণে শুরু হওয়া একটি বার্ষিক ধর্মীয় আচার আজ কোটি কোটি মানুষের আবেগ, অর্থনীতি ও সৃজনশীলতার এক মহা-আধার। বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রমাণ করেছে যে, বাঙালি সংস্কৃতির মূল শক্তি তার সর্বজনীনতার মধ্যে নিহিত, যেখানে দেবী আবাহনের আনন্দ ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য মুছে দিয়ে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়।

PREV
Religion News (ধর্মের খবর): Read latest news and updates on religion in bengali , Spiritual News, Puja Vratham, Fasting Rule. Find Bengali Religious News, Spiritual News on Asianet Bangla News.
Read more Articles on
click me!

Recommended Stories

Janmashtami 2026: গোপালের কোন রঙের পোশাকে আসবে সৌভাগ্য? দূর করবে দারিদ্রতা
Krishna Janmashtami: বাড়ির দরজায় কেন আঁকা হয় ছোট্ট কৃষ্ণের পায়ের ছাপ? জানুন আসল কারণ