
Kaushiki Amavasya: কৌশিকী অমাবস্যার রাত মানেই চারিদিকের নিকষ কালো অন্ধকার আর ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। গ্রামের বয়স্করা বলেন, এই রাতে তন্ত্রসাধকেরা জাগ্রত হন, আর বাতাসে ঘুরে বেড়ায় অতৃপ্ত আত্মা। এই রাতে একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে—কাউকে নাম ধরে ডাকলে প্রথম ডাকে সাড়া দিতে নেই, কারণ সেটা হতে পারে 'নিশির ডাক'। আর বাড়ির ঠাকুমা-দিদিমারা কঠোরভাবে নিষেধ করেন রাতে ভাত খেতে। তাদের মতে, এই পবিত্র ও ভয়ংকর তিথিতে রাতে অন্ন গ্রহণ করলে শরীরে অশুভ শক্তির প্রবেশ ঘটে।
কৌশিকী অমাবস্যার লোকগাঁথা ও নিশির ডাক বাংলার লোকবিশ্বাসে কৌশিকী অমাবস্যার রাতকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অলৌকিক শক্তির জাগরণকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিশেষ রাতে প্রকৃতির চেনা রূপ বদলে যায়, আর চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক অদ্ভুত টান। লোকগাঁথা অনুযায়ী, এই নিস্তব্ধ রাতে এক ধরণের অতৃপ্ত মায়াবী শক্তি ঘুরে বেড়ায়, যাকে সাধারণ ভাষায় 'নিশি' বলা হয়।নিশির ডাকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কখনো অচেনা গলায় ডাকে না। মাঝরাতে যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে চরাচর, তখন জানলার বাইরে বা উঠোন থেকে ভেসে আসে অত্যন্ত চেনা এবং প্রিয় কোনো মানুষের কণ্ঠস্বর। এই শক্তিটি সাধারণত মানুষের অবচেতন মনকে আকর্ষণ করে।
লোকগাঁথার নিয়ম অনুযায়ী, নিশির ডাকে প্রথমবার সাড়া দিলে বা তৎক্ষণাৎ ঘরের দরজা খুললে, সেই মানুষটি সম্মোহিত হয়ে পড়ে। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে নদী, পুকুর বা কোনো নির্জন বাঁশঝাড়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে গ্রামীণ বাংলায় নিয়ম ছিল, গভীর রাতে কেউ ডাকলে অন্তত তিনবার ডাকার অপেক্ষা করতে হতো এবং নিশ্চিত না হয়ে সাড়া দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল।
রাতে ভাত খেতে নিষেধ করার কারণকৌশিকী অমাবস্যার রাতে পরিবারের বয়স্করা কেন ভাত খেতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন, তার পেছনে লোকবিশ্বাস এবং আয়ুর্বেদিক—উভয় কারণই জড়িয়ে রয়েছে:তামসিক শক্তির প্রভাব ও শারীরিক জড়তা: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভাত হলো 'অন্ন', যা শরীরে অলসতা এবং গভীর ঘুম (তামসিক ভাব) তৈরি করে। এই রাতে নেতিবাচক শক্তিরা মানুষের মন ও শরীরকে দুর্বল করতে চায়। রাতে ভারী অন্ন বা ভাত খেলে শরীর ও মস্তিষ্ক এতটাই আড়ষ্ট হয়ে পড়ে যে, কোনো অলৌকিক বিপদ বা নিশির ডাকের মতো সম্মোহনী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো মানসিক সজাগতা বা আত্মরক্ষা করার ক্ষমতা মানুষের থাকে না। কৌশিকী অমাবস্যা হলো তন্ত্র ও শক্তি সাধনার রাত। এই তিথিতে উপবাস থাকা বা লঘু আহার (যেমন লুচি, রুটি বা ফল) গ্রহণ করাকে আধ্যাত্মিক ও মানসিকভাবে পবিত্র থাকার উপায় মনে করা হতো, যাতে কোনো অশুভ শক্তি সহজে শরীরে ভর করতে না পারে।
এক অন্ধকার রাতের লোকগাথা (কাহিনী)তারিখটা ছিল কৌশিকী অমাবস্যা। নিঝুম রাতের অন্ধকারে পুরো গ্রাম যেন নিস্পন্দ হয়ে আছে। বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর মেঘলা আকাশ, কোনো চাঁদ নেই, তারা নেই।সেই রাতে গ্রামের এক গৃহস্থ বাড়িতে ঠাকুমা সবাইকে কড়া পাহাড়ে রেখেছিলেন। নিয়ম মেনে সেদিন রাতে উনুনে হাঁড়ি চড়েনি, রাতের আহারে ভাতের কোনো স্থান ছিল না। কিন্তু বাড়ির এক সদস্য অলক্ষ্যে সেই নিয়ম অমান্য করে, খিদে সহ্য করতে না পেরে আগের দিনের বেঁচে যাওয়া ঠান্ডা ভাত লুকিয়ে খেয়ে নেয়।মাঝরাতে যখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আরও তীব্র হয়ে উঠল, তখন সেই সদস্যটির শরীর ভাতের ভারী অলসতায় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঠিক তখনই জানলার ওপাশ থেকে একটা অতি পরিচিত গলা ভেসে এল। খুব চেনা, আদুরে এক কণ্ঠস্বর—ঠিক যেন তার নিজের মায়ের গলা, যা বহু দূর থেকে ভেসে আসছে। ভাত ঘুমের নেশায় তার মস্তিস্ক তখন সঠিক বিচার করার ক্ষমতা হারিয়েছে। সম্মোহিতের মতো সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘরের বাকিরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করার আগেই, সে এক ডাকেই সাড়া দিয়ে দিল এবং অবশ পায়ে সদর দরজার খিলটা খুলে ফেলল।
বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারে তখন একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে, যার কোনও অবয়ব নেই, শুধু চেনা গলায় সে ডেকে চলেছে।ভারী শরীরে সে যখনই সেই মায়াবী ডাকের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপ থেকে এক তান্ত্রিকের মন্ত্রোচ্চারণ এবং শাঁখের আওয়াজ বাতাসে ভেসে এল। সেই পবিত্র ধ্বনিতে সম্মোহনের ঘোরটা এক মুহূর্তে কেটে গেল। সে দেখল, সে কোনো মায়ের সামনে নয়, বরং এক অতল দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর এক পা এগোলেই মৃত্যু।ভাতের অলসতা এবং নিশির ডাকের সেই মায়াবী ফাঁদ থেকে সে অল্পের জন্য বেঁচে ফিরেছিল। সেই থেকে লোকমুখে আজও রটে আছে—কৌশিকী অমাবস্যার রাতে সজাগ থাকতে হয়, অন্ন গ্রহণ করে শরীরকে তামসিক করতে নেই, আর নিশির ডাকে কখনো সাড়া দিতে নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য- এশিয়ানেট নিউজ বাংলা কোনও কুসংষ্কার প্রচার করে না। কেবল তথ্য ও প্রাচীন লোকগাঁথা তথ্য শেয়ারের জন্য এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হল।