
কলকাতার বুকেই লুকিয়ে আছে ডাকাতদের আরাধ্যা এক জাগ্রত কালী। যার দু’হাত আজও শিকলে বাঁধা। রঘু ডাকাতের ডাকাতি থেকে শুরু করে মা সারদার আশীর্বাদ— এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গা শিউরে ওঠা ইতিহাস। কোন মন্দির এটি? জানুন সেই অলৌকিক কাহিনি।
রঘু ডাকাত যাবেন ডাকাতি করতে। অবশ্য চুপিচুপি নয়, গৃহস্থকে আগেভাগে জানিয়েই তাঁর বাড়িতে যেতেন রঘু। একরকম চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দিতেন, ‘দম থাকলে আটকে নে’। এমনই আরেক ডাকাতির ছক কষলেন রঘু ও তাঁর দলবল। কিন্তু এই বার যাঁর বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন, সেই গৃহস্থ আবার কালীর উপাসক। রঘু ডাকাতের চিঠি পেয়েই মনে আতঙ্ক। লেঠেল দিয়েও তাঁকে রোখা দায়। তাই ডাকাতি আটকাতে হত্যে দিয়ে পড়লেন কালীর পায়ে। পারলে তিনিই পারবেন। এই গল্প শুধু গল্প নয়, খাস কলকাতার বুকেই আজও তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মন্দির— কাঁকুড়গাছির ডাকাত কালী মন্দির।
অষ্টাদশ শতকে বাংলায় ত্রাস ছিলেন রঘু ডাকাত ও তার ভাই বিশু ডাকাত। হুগলির আমতা থেকে কলকাতার বাগবাজার পর্যন্ত ছিল তাদের দাপট। লোকমুখে শোনা যায়, রঘু ডাকাত নাকি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান কালী ভক্ত। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মায়ের পুজো না করে তিনি বেরোতেন না। আর ডাকাতির টাকার একটা বড় অংশ তিনি গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। অনেকটা রবিনহুডের মতো।
এই মন্দিরের মূর্তিটি দেখলেই চমকে উঠবেন। এখানে মা কালীর দু’হাত শিকল দিয়ে বাঁধা। এর পিছনে রয়েছে দুটি জনশ্রুতি।
প্রথম জনশ্রুতি অনুযায়ী, একবার রঘু ডাকাত পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তখন তিনি মা কালীকে স্মরণ করেন। মায়ের কৃপায় অলৌকিকভাবে তার হাতের শিকল খুলে যায় এবং তিনি পালাতে সক্ষম হন। সেই থেকেই তিনি মায়ের মূর্তির হাতেও শিকল পরিয়ে দেন, প্রতীকী হিসেবে— মা-ই তো ভক্তকে বন্ধন থেকে মুক্ত করেন।
আর দ্বিতীয় গল্পটি আরও অলৌকিক। বলা হয়, রঘু ডাকাতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসীরা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন। মা নাকি স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, "আমি রঘুকে বেঁধে রেখেছি, আর ভয় নেই।" তার পর থেকেই নাকি রঘু ডাকাতের দাপট কমতে থাকে এবং মন্দিরে মায়ের হাতে শিকল পরানো হয়, যাতে মা আর কাউকে এভাবে আটকে না রাখেন।
এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মা সারদা দেবীর নামও। বলা হয়, ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের সহধর্মিণী মা সারদা একবার এই ডাকাত কালী দর্শনে এসেছিলেন। এই মন্দিরের পাশ দিয়েই ছিল তাঁর যাতায়াতের পথ। মন্দিরের তৎকালীন সেবায়েতের অনুরোধে তিনি মাকে পুজো দেন এবং আশীর্বাদ করেন। সেই থেকে এই মন্দির আরও বেশি জাগ্রত বলে ভক্তদের বিশ্বাস। অনেকে বলেন, মা সারদা বলেছিলেন, "এখানে মা জাগ্রত, এখানে যা চাইবে তাই পাবে।"
এই প্রসিদ্ধ ডাকাত কালী মন্দিরটি অবস্থিত উত্তর কলকাতার কাঁকুড়গাছি মোড়ের কাছে, নারকেলডাঙা এলাকায়। অনেকেই একে কাঁকুড়গাছি ডাকাত কালী বা নারকেলডাঙা ডাকাত কালী মন্দির বলেন। বিধাননগর স্টেশন থেকে অটোতে ১০ মিনিট।
আজও প্রতি অমাবস্যা ও কালীপুজোর রাতে এখানে হাজার হাজার ভক্তের ভিড় হয়। আজও ডাকাতদের মতোই ভক্তরা মায়ের কাছে এসে নিজেদের মনস্কামনা জানিয়ে যান। বিশ্বাস করা হয়, মা এখানে খুব জাগ্রত এবং ভক্তের ডাক কখনও ফেরান না।