
পিতৃপক্ষের অবসান আর দেবীপক্ষের সূচনা এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণেই আসে মহালয়া। বাঙালির কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। ভোরের আলো ফুটতেই রেডিয়োতে বেজে ওঠে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, আর চারদিকে শুরু হয় দুর্গাপুজোর আগমনী আবহ। তবে শুধু দেবীপক্ষের সূচনা নয়, প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে মহালয়া। এই দিনে বহু মানুষ গঙ্গাস্নান করে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ ও পিণ্ডদান করেন। কিন্তু জানেন কি, মহালয়ার এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহাভারতের কর্ণের এক আশ্চর্য কাহিনি?
মহালয়া শব্দের অর্থ কী?
‘মহালয়া’ শব্দের অর্থ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘মহা’ এবং ‘আলয়’ শব্দের সংযোগে তৈরি হয়েছে এই শব্দ, যার অর্থ মহৎ আবাস বা মহান আশ্রয়। আবার লোকবিশ্বাসে এই দিনটির সঙ্গে প্রয়াত আত্মাদের জগতেরও সম্পর্ক রয়েছে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের শেষ দিনে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের উদ্দেশে জল ও খাদ্য নিবেদন করা হয়। অন্যদিকে, দেবীপক্ষের সূচনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপুজোর প্রতীক্ষা। অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক হিসেবেও মহালয়াকে দেখা হয়। ‘মহালয়’ না হয়ে ‘মহালয়া’ কেন বলা হয়, তা নিয়েও নানা মত রয়েছে। তবে এই শব্দের প্রচলিত রূপ ও অর্থের ব্যাখ্যা নিয়ে একাধিক ধারণা থাকলেও, এর কোনও একক সর্বজনস্বীকৃত ব্যাখ্যা নেই।
মহাভারতের কর্ণের সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে মহালয়া? মহালয়াকে ঘিরে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিগুলির মধ্যে অন্যতম হল মহাভারতের কর্ণের গল্প। লোকপ্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মৃত্যুর পর কর্ণ স্বর্গে পৌঁছন। সেখানে তাঁকে খাদ্য হিসেবে দেওয়া হতে থাকে সোনা, রুপো ও মূল্যবান রত্ন।
বিষয়টি দেখে বিস্মিত কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে প্রশ্ন করেন, তাঁকে খাবারের বদলে কেন ধনরত্ন দেওয়া হচ্ছে? তখন ইন্দ্র জানান, জীবদ্দশায় কর্ণ প্রচুর সোনা ও সম্পদ দান করেছেন। কিন্তু নিজের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে কখনও খাদ্য বা জল নিবেদন করেননি। সেই কারণেই তাঁকে স্বর্গে খাদ্যের পরিবর্তে ধনরত্ন দেওয়া হচ্ছে বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।
কেন মর্ত্যে ফিরে এসেছিলেন কর্ণ?
কাহিনি অনুসারে, কর্ণ নিজের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে জানতেন না বলেই তাঁদের উদ্দেশে কোনও দান বা তর্পণ করেননি বলে জানান। এরপর তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মর্ত্যে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। মর্ত্যে ফিরে এসে কর্ণ পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে খাদ্য ও জল নিবেদন করেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ঘটনার স্মৃতি থেকেই পিতৃপক্ষের সময়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ ও পিণ্ডদানের রীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি একটি পৌরাণিক ও লোকপ্রচলিত কাহিনি। মহাভারতের মূল আখ্যানের সঙ্গে এই কাহিনির প্রচলিত রূপের সব বিবরণ এক নয়।
মহালয়ার তাৎপর্য কোথায়?
মহালয়া শুধু দুর্গাপুজোর আগমনী বার্তা নয়, এটি পূর্বপুরুষদের স্মরণ, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে মনে করারও একটি বিশেষ দিন। একদিকে তর্পণের মাধ্যমে অতীতের সঙ্গে যোগসূত্র বজায় রাখেন অনেকে, অন্যদিকে দেবীপক্ষের সূচনা নতুন আশা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে।
তাই বাঙালির কাছে মহালয়া একই সঙ্গে স্মৃতির, ভক্তির এবং উৎসবের দিন। আর মহাভারতের কর্ণকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনি এই দিনের তাৎপর্যকে আরও গভীর করে তুলেছে।