
বরিশালের বিখ্যাত শঙ্কর মঠের কাছে খোলা মাঠে একটি জনসভায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য একটি গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ আবেগের সঙ্গে বলে চলেছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে জড়ো হওয়া হাজার হাজার লোক গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনছিল তাঁর কথা। ১৯২৯ সালের জুলাই মাসের সেই দিন জেলা রাজনৈতিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ দিচ্ছিলেন সুভাষ। তাঁর বক্তৃতা শেষ হলে, কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, যিনি কলকাতা থেকে সুভাষের সঙ্গে এসেছিলেন, লক্ষ্য করলেন যে সুভাষ মঞ্চ থেকে উধাও। হঠাৎ সম্মেলনের প্রধান সংগঠক পাশে উপস্থিত হয়ে তাঁকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত করেন। ‘কোথায়?’ সাবিত্রীপ্রসন্ন জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে শুধু বলা হল সুভাষবাবু আপনাকে ডেকেছেন।
সাবিত্রীপ্রসন্নকে শঙ্কর মঠের দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলে তিনি সেটা বন্ধ দেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কী ঘটছে তা ভাবতে ভাবতেই মঠের দরজা খুলে গেল এবং একে একে বেরিয়ে এলেন বাংলার নেতৃস্থানীয় বিপ্লবীরা- অরুণচন্দ্র গুহ, সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী এবং আরও কয়েকজন। শেষের দিকে বেরিয়ে এসে সুভাষ মৃদু হেসে বিস্মিত সাবিত্রীপ্রসন্নের সঙ্গে একজন লোকের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি সম্মেলনস্থলে ফিরে গেলেন। লোকটি খুব একটা লম্বা নন, শ্যামবর্ণ এবং পাতলা হয়ে যাওয়া মাথার চুল। মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গে এই প্রথম সাবিত্রীপ্রসন্নের সাক্ষাৎ। এর প্রায় নয় মাসের মধ্যেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযানের নেতা হিসাবে সারা দেশে মাস্টারদার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের মধ্যেই বিভিন্ন জেলা থেকে বিপ্লবীদের একটি দল এইভাবে অত্যন্ত গোপনীয়তায় সুভাষের সঙ্গে দেখা করেন। কী আলোচনা হয়েছিল তা বাইরের কেউ কোনওদিন জানতে পারেননি, কিন্তু সাবিত্রীপ্রসন্ন পরে অনুমান করেছিলেন যে ১৯৩০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সঙ্গে নিশ্চয়ই এর কোনও সম্পর্ক ছিল। এতে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না। বিপ্লবীদের গোপন কার্যপদ্ধতিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন সুভাষ। যার যতটূকু প্রয়োজন সে ততটুকুই শুধু জানতে পারত।
ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবী দলগুলির সঙ্গে সুভাষের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল তা তাঁকে এই গোপন কৌশলগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে সুভাষ তাঁর বন্ধু, যুগান্তর দলের ভূপেন্দ্রকুমার দত্তের জন্য পিটার ক্রোপোটকিনের নিষিদ্ধ স্মৃতিকথা বইটি অত্যন্ত গোপনে নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আসেন। ধরা পড়লেই নিশ্চিত কারাবাস।
গোপন বৈপ্লবিক পন্থা, যা সুভাষচন্দ্রের সমগ্র রাজনৈতিক কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে, এখনও গবেষক এবং জীবনীকারদের কাছ থেকে যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি। একমাত্র ব্রিটিশ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অফিসাররাই সম্ভবত সুভাষের ব্যক্তিত্বের দিকটি উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত থেকেই সুভাষকে ক্রমাগত অনুসরণ করতে থাকে ইংরেজদের চরেরা, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই তাঁর পরিচিত বৃত্তে ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। সুভাষ অবশ্য এ সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে সচেতন ছিলেন। বিড়াল এবং ইঁদুরের এই খেলায়, সুভাষ ইংরেজদের বারবার প্রতারণা করতে অসাধারণভাবে সফল হয়েছিলেন।
সুভাষচন্দ্রের উপর নজরদারির প্রথম তথ্য পাওয়া যায় ১৯২৪ সালের একটি পুলিশ রিপোর্টে। রাজনীতিতে তখনও তিনি নতুন এবং সবে কলকাতা কর্পোরেশনের চিফ এগজেকিউটিভ অফিসার নিযুক্ত হয়েছেন। সেই বছরই অক্টোবরে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। সরকারি রিপোর্টে দেখা যায় যে তিনি জাতীয় আন্দোলনে যোগদানে করার পর থেকেই বিস্তৃত নজরদারির অধীনে চলে আসেন এবং তার ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় ও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা সাজানো হয়। এর থেকেই বোঝা যায় যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির বিপ্লবী দলগুলির মধ্যে কতটা ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশে করতে পেরেছিল। রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে সুভাষের সম্পর্কে খবর জোগাড় করার জন্য চারটি পুলিশ দপ্তরের দশজন গোয়েন্দা তাঁর উপর নজর রেখে চলেছিল।
উল্টোদিকে সুভাষ এবং তাঁর বিপ্লবী সহকর্মীরাও সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন তৈরি করতে সক্ষম হন। এ কাজের গোপন প্রকৃতির কারণেই বেশিরভাগ তথ্য অজানা থেকে যায়। এরকম একটি ঘটনা সামনে চলে আসে যখন অমূল্য মুখার্জী, যিনি একজন সহকারী জেলর ছিলেন, গুরুতর হিসাবের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে ১৯২৭ সালে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। মুখার্জীকে বরখাস্ত করার পর জানা যায় যে তিনি জেলের ভিতরে বন্দি এবং বাইরের বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিলেন। মুখার্জী ১৯৩৯ সালে সুভাষের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। সুভাষের রাজনৈতিক কর্মজীবন জুড়ে পুলিশের নজরদারির এবং তাঁর পাল্টা গোয়েন্দাগিরির এই ধারা অব্যাহত থাকে। এত ঘটনা আছে যে এ বিষয়ে একটা আলাদা বই লেখা যায়।