
Asian Games 2026 Rowing: এবারের এশিয়ান গেমসে রোয়িংয়ে ইতিহাস গড়ল ভারত। বৃহস্পতিবার আইচি-নাগোয়ায় (Aichi-Nagoya) পুরুষদের ডাবল স্কালস ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতলেন সতনাম সিং (Satnam Singh) ও সলমন খান (Salman Khan)। ৬ মিনিট ১৩.২৫ সেকেন্ড সময় করে তৃতীয় হয় ভারতীয় জুটি। এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টে প্রথমবার পদক জিতল ভারত। সোনা জিতেছে চিনের ই জুডি ও ইদে নিয়ে জুটি। উজবেকিস্তানের পাভেল সোরিন ও মেখরোজবেক মামাতকুলভ পেয়েছেন রুপো। এদিন শুরু থেকেই পদকের লড়াইয়ে ছিলেন সতনাম ও সলমন। ৫০০, ১০০০ এবং ১৫০০ মিটার, তিন পর্যায়েই দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তাঁরা। তবে শেষ ৫০০ মিটারে তাঁদের পিছনে ফেলে দেয় উজবেক জুটি। শেষমুহূর্তে তৃতীয় স্থান ধরে রেখে ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেন দুই ভারতীয় রোয়ার।
এই পদক সলমনের কাছে বিশেষ তাৎপর্যের। এই রোয়ার প্রথমবার এশিয়ান গেমসে পদক জিতলেন। রোয়িংয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর। এর আগে সংসার চালাতে দিল্লিতে ক্যাব চালাতেন তিনি। উত্তরপ্রদেশের আমেঠি জেলার পুরে ধিংগাইয়ে জন্ম সলমনের। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। তাঁর বাবা মহম্মদ কাসিম খান হরিয়ানার তাউরুতে ট্রাকের বডি তৈরির কাজ করতেন। সেখানেই পড়াশোনা করেন সলমন। ১৮ বছর বয়সে ডেঙ্গিতে বাবার মৃত্যু হলে পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে সলমনের কাঁধে। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন সাময়িকভাবে পিছিয়ে যায়। পরিবারের খরচ চালাতে দিল্লিতে ক্যাব চালাতে শুরু করেন তিনি। দিন-রাত পরিশ্রম করে ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব সামলাতেন। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন সলমন। তাঁর উচ্চতা ও শারীরিক গঠন সেনাবাহিনীর জন্য উপযুক্ত হতে পারে বলে ওই বন্ধু তাঁকে জানান। ক্যাব চালানো ছেড়ে চার মাস নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। শেষ পর্যন্ত নিয়োগ র্যালি, মেডিক্যাল ও লিখিত পরীক্ষা পেরিয়ে ২০১৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পুণের বম্বে ইঞ্জিনিয়ার গ্রুপে যোগ দেন তিনি। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরই রোয়িংয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় সলমনের। কোচ সত্যবান, সতীশ সিরাট ও প্রভাত মিশ্র তাঁর শারীরিক সক্ষমতা দেখে তাঁকে রোয়িংয়ে আসার পরামর্শ দেন। প্রথমে এই খেলায় খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না সলমন। কিন্তু কোচরা তাঁকে উৎসাহ দিতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত নৌকায় ওঠেন তিনি। প্রথম ইন্টার-সেন্টার রেগাটাতেই রুপো জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এরপর ব্যাটালিয়ন ও ইন্টার-সেন্টার প্রতিযোগিতায় একের পর এক পদক জিততে থাকেন। ২০২১ সালে এরগোমিটার পরীক্ষার নির্দিষ্ট মান পূরণ করে পুণের সিএমই-র আর্মি রোয়িং নোডে জায়গা পান সলমন। দেশের সেরা কয়েকজন রোয়ারের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। কেরিয়ারের এক পর্যায়ে দু’বার রোয়িং ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। তবে সিনিয়র কোচ কুদরত আলি এবং ট্রেনিং অফিসার মেজর নাগেন্দ্র হুডার মতো ব্যক্তিরা তাঁকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেন। এরপর সাফল্যও আসতে শুরু করে। ২০২২ সালে গুজরাটে ৩৬-তম জাতীয় গেমসে সোনা জেতেন সলমন। একই বছর পঞ্চম ইন্ডোর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপেও সোনা পান। ২০২৩ সালে সিনিয়র ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো এবং ওপেন স্প্রিন্ট ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতেন। একই বছর লুসার্নে বিশ্ব রোয়িং কাপ-৩-তেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।
অন্যদিকে, সতনামের রোয়িংয়ে আসার গল্পও অন্যরকম। পাঞ্জাবের মানসা জেলার সতনাম আগে জাতীয় স্তরের হ্যান্ডবল খেলোয়াড় ছিলেন। ২০১৮ সালে রোয়িংয়ে যোগ দেন। অলিম্পিয়ান স্বর্ণ সিং ভির্ক তাঁর শারীরিক সক্ষমতা দেখে তাঁকে রোয়িংয়ে আসার পরামর্শ দেন। এরপর দ্রুত নিজেকে রোয়িংয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন সতনাম। ২০১৮ সালের যুব অলিম্পিক্সে পুরুষদের পেয়ার ইভেন্টে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে অষ্টম হন। পরে ৪০-তম সিনিয়র জাতীয় রোয়িং চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষদের সিঙ্গল স্কালসে সোনা জেতেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় নৌসেনা রোয়ার হিসেবে এই ইভেন্টে জাতীয় খেতাব জেতেন। ২০২৩ সালে হাংঝাউ এশিয়ান গেমসে ভারতের পুরুষদের কোয়াড্রুপল স্কালস দলের সদস্য হিসেবে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন সতনাম। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে এশিয়ান রোয়িং চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষদের কোয়াড্রুপল স্কালসে সোনা জেতেন। একই বছর ইন্ডোর এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে পুরুষদের ডাবল স্কালসে রুপো পান। আইচি-নাগোয়ায় বৃহস্পতিবার সেই সাফল্যের তালিকায় আরও একটি এশিয়ান গেমস পদক যোগ করলেন সতনাম। আর সলমনের জন্য এটি প্রথম।
আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।