
পুনে ২০৩২ সালের ইউনিয়ন সাইক্লিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (ইউসিআই) রোড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের দায়িত্ব জিতে নিয়েছে। এর ফলে ভারতের মাটিতে এই প্রথম সাইক্লিংয়ের এত বড় কোনও বিশ্ব আসর বসতে চলেছে। মহারাষ্ট্র তথা গোটা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
মহারাষ্ট্র সরকার এবং সাইক্লিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (সিএফআই) যৌথভাবে এই আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল। এতে ভারত সরকারের পূর্ণ সমর্থন ছিল। পুনেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা সাইক্লিং ডেস্টিনেশন হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে মহারাষ্ট্র এবং গোটা দেশে সাইক্লিংয়ের একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তৈরি হবে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে এই ঘোষণা এমন একটা সময়ে এল, যার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০৩৬ সালের অলিম্পিক গেমস আয়োজনের ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। সেই লক্ষ্যে দেশের ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন প্রতিভা তুলে আনার কাজ চলছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্প্রতি 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২৫' অনুমোদন করেছে। ২০৩৬ সালের অলিম্পিক সহ আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতকে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই এই নীতির লক্ষ্য।
ইউসিআই কংগ্রেস কানাডার মন্ট্রিয়লে পুনের নাম চূড়ান্ত আয়োজক হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেখানে ইউসিআই-এর কাছে পুনের হয়ে চূড়ান্ত প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়। মহারাষ্ট্র সরকারের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল মন্ট্রিয়লে উপস্থিত থেকে পুনের হয়ে জোরালো সওয়াল করে।
আন্তর্জাতিক সাইক্লিং ক্যালেন্ডারে ইউসিআই রোড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অন্যতম সম্মানজনক একটি টুর্নামেন্ট। বিশ্বের সেরা সাইক্লিস্টরা এখানে বিখ্যাত রেইনবো জার্সির জন্য লড়াই করেন। এই টুর্নামেন্টের বিশালত্ব এর পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। যেমন, ২০২৫ সালের কিগালি আসরে ১১৩টি দেশের ৭৩৪ জন সাইক্লিস্ট অংশ নিচ্ছেন। প্রায় ২০ লক্ষ দর্শক মাঠে বসে এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ টিভিতে এই প্রতিযোগিতা দেখবেন। পাঁচ মহাদেশের ৩০৮ জন সাংবাদিক এই ইভেন্ট কভার করবেন।
ভারতের কাছে এই জয় একটা বড় সুযোগ। এর ফলে বিশ্বের তাবড় সাইক্লিস্টরা ভারতে আসবেন। পাশাপাশি দেশের অ্যাথলিটদের উন্নতি, পরিকাঠামো তৈরি এবং খেলাধুলোর প্রসারে এটি দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা নেবে। ভারতে সাইক্লিংয়ের বিশাল জনপ্রিয়তা, তৃণমূল স্তরে এর প্রসার এবং ইউসিআই ইভেন্ট আয়োজনের পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই এই বিড জেতা সম্ভব হয়েছে।
২০২৬ সালের পুনে গ্র্যান্ড ট্যুর বাস্তব রেস কন্ডিশনে ভারতের প্রস্তুতি প্রমাণ করে দিয়েছে। ২৫টির বেশি সরকারি দপ্তরের সমন্বয়ে ৪৩৭ কিলোমিটার রেস-রেডি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। ২০৩২ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আসার আগে, পুনে টানা ছ'বছর গ্র্যান্ড ট্যুর আয়োজনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে।
ইউসিআই সভাপতি ডেভিড ল্যাপার্টিয়েন্ট বলেন, "পুনের জেলাশাসক জিতেন্দ্র দুদির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল ইউসিআই ম্যানেজমেন্ট কমিটির কাছে বাজাজ পুনে গ্র্যান্ড ট্যুর নিয়ে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তা অত্যন্ত উৎসাহজনক। সাইক্লিং এখন নতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতে এই খেলার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল, কারণ এখানকার স্টেকহোল্ডাররা দারুণ উৎসাহী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
ভারত পুনে নির্বাচিত হওয়ার ফলে বিশ্বের নামিদামি আয়োজক দেশগুলোর তালিকায় ঢুকে পড়েছে। গত পাঁচটি ইউসিআই রোড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার উলংগং (২০২২), গ্লাসগো এবং স্কটল্যান্ড (২০২৩), সুইজারল্যান্ডের জুরিখ (২০২৪), রুয়ান্ডার কিগালি (২০২৫) এবং কানাডার মন্ট্রিয়লে (২০২৬)।
আগামী বছরগুলোতে এই চ্যাম্পিয়নশিপের পরিধি আরও বাড়বে। ২০২৭ সালে ফ্রান্সের হাউট-সাভয়, ২০২৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবু ধাবি, ২০২৯ সালে ডেনমার্ক, ২০৩০ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং ২০৩১ সালে ইতালির ট্রেন্টিনো এই আসর আয়োজন করবে। এরপর ২০৩২ সালে তা আসবে পুনেতে।
পুনের জেলাশাসক জিতেন্দ্র দুদি বলেন, "পুনের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মহারাষ্ট্র সরকার এবং সাইক্লিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার যৌথ স্বপ্নের ফসল এটি। ইউসিআই রোড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করা মানে শুধু একটা সাইক্লিং রেস করা নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক সাইক্লিংয়ের মানচিত্রে পুনে এবং ভারত একটা বড় জায়গা করে নিল। এর মাধ্যমে এলিট স্পোর্টস, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, গ্লোবাল ব্রডকাস্টিং, পর্যটন এবং অর্থনীতির দারুণ মেলবন্ধন ঘটবে। সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বমানের শহর হিসেবে পুনে নিজের পরিচিতি আরও মজবুত করার সুযোগ পেল।"
সাইক্লিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি জেনারেল মনিন্দর পাল সিং বলেন, "ভারতীয় সাইক্লিংয়ের জন্য এটি শুধু অংশগ্রহণ থেকে পারফরম্যান্সের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। আন্তর্জাতিক রেস আয়োজন থেকে শুরু করে বিশ্ব সাইক্লিংয়ের মূল স্রোতে ঢুকে পড়ার একটা দারুণ মঞ্চ। ২০৩২ সালের আগের এই সময়টায় আমরা আমাদের অ্যাথলিট, কোচ এবং টেকনিক্যাল অফিসারদের আরও উন্নত করার কাজ করব। সাইক্লিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া এমন একটা ইকোসিস্টেম তৈরি করতে বদ্ধপরিকর, যা বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।"
২০৩৬ সালের প্রস্তাবিত অলিম্পিক গেমসের ঠিক চার বছর আগে ২০৩২ সালের এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ভারতের জন্য একটা বড় মাইলফলক হতে চলেছে। এত বড় একটা গ্লোবাল স্পোর্টিং ইভেন্ট সফলভাবে আয়োজন করার ক্ষমতা যে ভারতের আছে, তা প্রমাণের এটাই সেরা সুযোগ।
ইউসিআই রোড ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ ভারতকে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ক্রীড়া দক্ষতা এবং সাইক্লিংয়ের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ করে দেবে। আর এই ঐতিহাসিক যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে পুনে।