
অযোধ্যা: শুক্রবার অযোধ্যা নগরীতে ভক্তি, উৎসাহ আর জাঁকজমকের সঙ্গে রামনবমী উৎসব পালিত হল। ভগবান রামের জন্মের সেই পবিত্র মুহূর্তে গোটা পরিবেশ 'ভয়ে প্রগট কৃপালা, দীন দয়ালা' জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই স্বর্গীয় ধ্বনি শুধু কানেই নয়, প্রত্যেক ভক্তের মনেও ভক্তির ঢেউ তুলেছিল।
রাম জন্মভূমি মন্দিরে রামলালার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল 'সূর্য তিলক'। ঠিক দুপুর ১২টায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে সূর্যের সোনালী রশ্মি গর্ভগৃহে পৌঁছে প্রায় চার মিনিটের জন্য রামলালার কপালে তিলকের মতো ফুটে ওঠে। এই দৃশ্যটি ছিল বিশ্বাস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের এক অসাধারণ মেলবন্ধন, যা লক্ষ লক্ষ ভক্ত সরাসরি এবং লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে দেখেন।
রামনবমী উপলক্ষে রাম জন্মভূমি মন্দির ফুল, আলো আর রঙিন লাইটিংয়ে সাজানো হয়েছিল। সকাল থেকেই মন্দির চত্বরে চলছিল বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, ভজন-কীর্তন এবং আরতি। বিধি মেনে রামলালার অভিষেক করা হয় এবং দুপুর ১২টায় সূর্য তিলকের মূল অনুষ্ঠান শেষ হয়।
এই বিশেষ সূর্য তিলক সিস্টেমটি বেঙ্গালুরুর বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন। এতে এমনভাবে সূর্যের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে তা ঠিক দুপুর ১২টায় ভগবানের কপালে তিলক এঁকে দেয়। প্রতি বছর রামনবমীতে এই প্রথা পালন করা হয়, যা ভারতের প্রাচীন জ্যোতিষ, বাস্তু জ্ঞান এবং আধুনিক অপটিক্যাল সায়েন্সের এক চমৎকার উদাহরণ।
ভক্তদের বিপুল ভিড়ের মধ্যে জায়গায় জায়গায় ভাণ্ডারার আয়োজন করা হয়েছিল। মথুরা থেকে আনা প্রায় ৫ কুইন্টাল পঞ্জিরি আর লাড্ডু প্রসাদ হিসেবে বিলি করা হয়। রাম পথ, সরযূ ঘাট এবং আশেপাশের এলাকাগুলিতে ভক্তদের ঢল নেমেছিল।
রামলালাকে ৫৬ রকমের ভোগ নিবেদন করা হয়। এছাড়া দশরথ মহল, কনক ভবন এবং হনুমান গঢ়ী সহ অযোধ্যার প্রায় ৮,০০০ মন্দিরে বিশেষ পূজা, কীর্তন এবং সৎসঙ্গের আয়োজন করা হয়েছিল।
উত্তরপ্রদেশ সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে নিরাপত্তার কড়া ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শহরকে একাধিক জোন এবং সেক্টরে ভাগ করা হয়। ড্রোন দিয়ে নজরদারি, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী, ট্র্যাফিক প্ল্যান এবং হোল্ডিং এরিয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই কঠোর ব্যবস্থার ফলে পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই উপলক্ষে দেশ ও রাজ্যের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রামলালার সূর্য তিলক হল আস্থা, আত্মগৌরব এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। তাঁর মতে, এই আয়োজন সনাতন সংস্কৃতির চেতনাকে জাগ্রত করে এবং ভারতকে তার মূল আত্মার সঙ্গে যুক্ত করে।
দেশ-বিদেশ থেকে আসা ভক্তরা এই মুহূর্তকে জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেছেন। প্রয়াগরাজ থেকে আসা এক মহিলা ভক্ত বলেন, "এই সূর্য তিলক প্রভু রামের সেই দিব্য জ্যোতির প্রতীক, যা গোটা বিশ্বকে আলোকিত করে।" অন্য ভক্তদের মতে, এই আয়োজন সমাজে নতুন শক্তি ও একতার সঞ্চার করেছে।
রামনবমী উপলক্ষে অযোধ্যায় ভক্তদের বিশাল ভিড় হয়। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ এবং ২৭ মার্চ প্রায় ৩৫ লক্ষ ভক্ত অযোধ্যায় এসেছিলেন। রাম মন্দিরে দুপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ দর্শন করেন, যা রাত পর্যন্ত ৪ লক্ষে পৌঁছানোর অনুমান করা হয়। ভক্তদের সুবিধা ও নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছিল, যার ফলে দর্শন প্রক্রিয়া মসৃণভাবে চলে।