
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের কণ্ঠ, লেখা এবং চেহারা হুবহু নকল করতে পারে। সিনেমা, শর্ট ফিল্ম বা বিজ্ঞাপনে আসল অভিনেতা নিতে লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। তাই খরচ বাঁচাতে চীনের প্রযোজকরা এখন এআই অভিনেতাদের দিকে ঝুঁকছেন।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চীনের সাধারণ মানুষ নিজেদের মুখ (Face Likeness) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য ভাড়ায় বা লাইসেন্সে দিচ্ছেন। ঘরে বসেই তারা ৭ ডলার থেকে ১৫,০০০ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬০০ থেকে ১২ লাখ টাকা) পর্যন্ত আয় করছেন। নতুন এই আয়ের পথ খুললেও, এটি মারাত্মক আইনি ও গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আগে সিনেমা তৈরির গোপন গ্রুপগুলোতে এই মুখের বেচাকেনা চলত। এখন ফেস-লাইসেন্সিং প্ল্যাটফর্ম বা স্টার্টআপগুলোর মাধ্যমে এটি একটি প্রকাশ্য বাজারে পরিণত হয়েছে। ব্যবহারকারীরা এসব প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন দিক থেকে তোলা নিজেদের ছবি ও ভিডিও আপলোড করেন। পরিচয় যাচাইয়ের পর তাদের একটি প্রোফাইল তৈরি হয়।
নিজের মুখ কোন ধরনের দৃশ্যে ব্যবহার করা যাবে, তা ব্যবহারকারী নিজেই ঠিক করে দেন। যেমন—পারিবারিক বা প্রেমের দৃশ্যে অনুমতি দিলেও, পর্নোগ্রাফি, হরর বা হিংসাত্মক দৃশ্যে মুখ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়। বিজ্ঞাপন, গেমিং অবতার এবং চীনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা মাইক্রো-ড্রামায় (এআই শর্ট ড্রামা) এই মুখগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।
মুখের লাইসেন্স দেওয়ার মাত্র তিন দিনের মধ্যে এক ব্যাংক কর্মীর মুখ ৭ বার ব্যবহার করে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থা। এর মাধ্যমে তিনি ২,৫০০ ইউয়ান (প্রায় ৩০,০০০ টাকা) আয় করেন।
'Xinzhua' নামের একটি প্ল্যাটফর্মে ৩৭০টির বেশি মুখ রয়েছে। সেখানে ৫০০ থেকে ৬,০০০ ইউয়ান পর্যন্ত ফি নেওয়া হয়। এই প্ল্যাটফর্মের এক নারী ব্যবহারকারী খলনায়িকা বা মৃত্যুর দৃশ্যেও নিজের মুখ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে টানা টাকা আয় করছেন।
গুয়াংডং প্রদেশের 'কেলে' নামের এক ব্যবহারকারী বলেন, "ভবিষ্যতে এআই এমনিতেই আমার অনুমতি ছাড়া আমার মুখ চুরি করবে। আমি সেটা আটকাতে পারব না। তার চেয়ে বরং কেউ আমাকে টাকা দিয়ে বৈধভাবে এটা ব্যবহার করুক।"
এআই প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও চীনের আইন বিশেষজ্ঞ এবং ক্রেতা সুরক্ষা সংগঠনগুলো কড়া সতর্কতা দিচ্ছে। অনেক প্ল্যাটফর্ম একতরফা চুক্তি করে ব্যবহারকারীদের কণ্ঠ, নাম এবং ভবিষ্যতের অধিকার চিরতরে কেড়ে নিচ্ছে।
কেউ যদি মাঝপথে মুখের লাইসেন্স বাতিল করতে চান, তবে তাকে ৫০,০০০ ইউয়ান (প্রায় ৬ লাখ টাকা) পর্যন্ত জরিমানা দিতে হয়। ১৪ বছরের কম বয়সীদের মুখ ব্যবহারের জন্য বাবা-মায়ের স্পষ্ট অনুমতি লাগে। কিন্তু ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা ভবিষ্যতের বিপদ না বুঝেই টাকার লোভে নিজেদের মুখ বিক্রি করে দিচ্ছে।
বৈধভাবে কেনা মুখ যদি পরে পর্নোগ্রাফি বা সাইবার অপরাধে ব্যবহার করা হয়, তবে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বেন ওই সাধারণ মানুষটিই।
গোপনীয়তার চূড়ান্ত সর্বনাশ
সাধারণ মানুষ একে সহজে আয়ের পথ ভাবলেও, বিশেষজ্ঞরা একে দুদিকে ধারালো তলোয়ারের সঙ্গে তুলনা করছেন। সামান্য টাকার বিনিময়ে কোম্পানিগুলোর হাতে নিজের পরিচয়ের আজীবন অধিকার তুলে দেওয়াটা ভবিষ্যতে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। সঠিক আইন না আনলে এই 'ফেস লাইসেন্সিং মার্কেট' মানুষের আসল পরিচয়কেই গিলে খাবে।
অল্প সময়ে সহজে টাকা আয়ের পথ মনে হলেও, তথ্য সুরক্ষার দিক থেকে এটি মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে।
অপরিবর্তনযোগ্য বায়োমেট্রিক:
পাসওয়ার্ড চুরি হলে তা বদলে ফেলা যায়, কিন্তু মানুষের মুখের গড়ন বদলানো যায় না। আজকাল ব্যাংক, স্মার্টফোন আনলক এবং সরকারি পরিচয় যাচাইয়ের কাজে ফেস রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। মুখের ডেটা একবার পাবলিক হয়ে গেলে এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
ডিপফেক আতঙ্ক:
এই ডেটা ফাঁস হলে অনুমতি ছাড়াই হুবহু নকল 'ডিপফেক' ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। এআই দিয়ে তৈরি নকল চেহারা ব্যবহার করে আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা হাতানো বা ব্ল্যাকমেইল করার মতো অপরাধও হু হু করে বাড়বে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে:
চুক্তিতে 'শুধু নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের জন্য' লেখা থাকলেও, ডিজিটাল দুনিয়ায় একবার ডেটা ঢুকে গেলে তা আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এআই মডেলের মাধ্যমে একজনের মুখ যখন হাজার হাজার ভিডিওতে ছড়িয়ে পড়বে, তখন কারা এর অপব্যবহার করছে তা খুঁজে বের করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।