অ্যানথ্রোপিকের নতুন রিপোর্টের পর এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে এআই গভর্ন্যান্স বা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কলম ধরেছেন রাজীব চন্দ্রশেখর।
অ্যানথ্রোপিক গত নয় মাসে এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে একটা রিভিউ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অগাস্ট পর্যন্ত নয় মাসের এই ১৫৪ পাতার রিপোর্টটি গত ১০ সেপ্টেম্বর সামনে আসে। অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই এরপরই এআই ডেভেলপমেন্টের গতি কমানোর ডাক দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্যাম অল্টম্যান আর ইলন মাস্কও তাঁর কথায় সায় দেন। সব মিলিয়ে দেখলে একটা বিষয় পরিষ্কার, এআই গভর্ন্যান্স এবার কোন দিকে মোড় নিতে চলেছে।
অ্যানথ্রোপিকের রিপোর্টে রাষ্ট্রায়ত্ত মদতপুষ্ট অপারেশন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্তরের জালিয়াতি— মোট সাত ধরনের ক্ষতিকর কাজের কথা বলা হয়েছে। এআই এখন আর শুধু ক্ষতিকর তথ্যই তৈরি করছে না। এটি অন্যান্য সফটওয়্যারের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে একই সঙ্গে একটা কাজের বিভিন্ন ধাপ শেষ করতে সাহায্য করছে। এর ফলে কম লোকবল আর সামান্য দক্ষতা দিয়েই বড়সড় সাইবার হামলা চালানো যাচ্ছে। অ্যানথ্রোপিক এর নাম দিয়েছে 'আপলিফট' (Uplift)। এআইয়ের গতি, পরিধি আর প্রভাব এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। যেমন, বাংলাদেশে ধরা পড়া একটা ফেক প্রোপাগান্ডা বা ভুয়া প্রচারের ঘটনা পুরোপুরি অটোমেটেড ছিল। এআই কনটেন্ট বানিয়েছে, অন্য সফটওয়্যার সেটাকে ভিডিওতে বদলেছে, আর শিডিউলিং অ্যালগরিদম ঠিক সময়ে সেটা পোস্ট করেছে। মাত্র একজন মানুষ, ২৯টা অ্যাকাউন্ট আর ১৫০০টা সাজানো গল্প। এটাই হলো 'আপলিফট'।
অ্যানথ্রোপিক যা খুঁজে পেয়েছে, তা হয়তো আসল ঘটনার একটা ছোট্ট অংশ মাত্র। তারা নিজেরাই স্বীকার করছে যে, তাদের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলো ব্যবহার করে কেউ যে বায়ো-উইপন বা জীবাণু অস্ত্র বানানোর গবেষণায় সাহায্য পাবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। এটা মোটেও স্বস্তির খবর নয়। বরং এটা প্রমাণ করে যে, এআইয়ের বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোনো নিয়মকানুন তৈরি হয়নি। আমোদেইয়ের সতর্কবার্তা একদম পরিষ্কার। এআই খুব দ্রুত এগোচ্ছে। আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে ভুয়া এআই এজেন্টরা পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে পারে। কোটি কোটি ডলার খরচ করে একে অপরের সঙ্গে লড়তে থাকা বিশ্বের শীর্ষ তিন এআই কোম্পানিও এই কথায় একমত। এটা নিছক কোনো পিআর স্টান্ট নয়, বরং রীতিমতো একটা রেড ফ্ল্যাগ বা বিপদের সংকেত।
এআইয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের ইচ্ছেমতো গতি কমানো কি আদৌ সম্ভব? আমি এক্স (X) হ্যান্ডেলে এই সহজ প্রশ্নটাই করেছিলাম। বাজারে টিকে থাকার লড়াই, পুঁজি আর চিন যেহেতু এই রেসের বাইরে আছে, তাই নিজেদের ইচ্ছেয় গতি কমানোটা খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট চামথ পালিহাপিট্টিয়া যেমনটা বলেছেন, বাজারে এগিয়ে থাকা কোনো কোম্পানি যখন গতি কমানোর কথা বলে, তখন বুঝতে হবে তারা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতেই এই চাল চালছে। তাই ইচ্ছেমতো গতি কমানোর এই আলোচনাটাই ভুল। কীভাবে ডেভেলপমেন্ট ধীর করা যায়, সেটা আসল প্রশ্ন নয়। বরং কীভাবে গভর্ন্যান্স বা নীতিমালা দ্রুত কার্যকর করা যায়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও আইটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার সময় আমরা একটা প্ল্যাটফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছিলাম। এর মূল ভিত্তি ছিল— নিরাপত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা আর দায়বদ্ধতা। ২০২১ সালের আইটি নিয়ম প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে আসে। আমরা ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই ওই ফ্রেমওয়ার্ক বানিয়েছিলাম। অ্যানথ্রোপিকের রিপোর্ট সেটাই প্রমাণ করছে।
বাংলাদেশের ঘটনাটা ভারতের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। দুষ্কৃতীরা এআই দিয়ে প্রচুর পরিমাণে কনটেন্ট বানিয়ে গ্রামীণ এলাকার ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে। ভারতে ৯৫ কোটির বেশি ভোটার রয়েছেন। বিভিন্ন ভাষায় এআই দিয়ে ভুয়া প্রচার চালানো খুব সহজ, কিন্তু ধরা খুব কঠিন। এই ধরনের কাজ আটকাতে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ দরকার। ভারতে কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্ল্যাটফর্মগুলোকে এআইয়ের কোনো অপব্যবহার ধরা পড়লে তা সার্ট-ইন (CERT-In) এবং এআই সেফটি অথরিটিকে জানাতে হবে। সরকারকে বাংলাদেশের মতো ঘটনা এড়াতে, রাজনৈতিক বা জনস্বার্থ জড়িত বিষয়ে এআই দিয়ে বানানো কনটেন্টে ওয়াটারমার্ক থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
এআই এখন বিভিন্ন সফটওয়্যার সিস্টেমের মাধ্যমে একাধিক ধাপের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। শুধু টেক্সট বানানো নয়, নিজে থেকে কাজ করতে পারে এমন এআই এজেন্টদেরও প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা আইনের আওতায় আনতে হবে। সরকারকে নতুন আইন করে ভুয়া এপিআই (API) অ্যাক্সেস নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ, যাচাই আর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আছে, এমন একটা আইনি কাঠামো আমাদের খুব দরকার।
এটা কার্যকর করার জন্য ভারতের পরিস্থিতি বেশ অনুকূল। আমরা আমেরিকার মতো লাগামছাড়া নই, আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রযুক্তি না বুঝে শুধু লক্ষ্যের পেছনেও ছুটি না। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত ডিপিআই (DPI), ইউপিআই (UPI), আধার আর আইটি আইনের মতো বড় বড় প্রযুক্তিগত নীতি বানিয়ে সফল হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির কর্তাদের এই ডাক আসলে সরকারগুলোর কাছে পদক্ষেপ নেওয়ার একটা আমন্ত্রণ। ভারত নিরাপত্তা আর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে এমন আইন বানানোর মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।
