
সূর্যের মতো শক্তি পৃথিবীতে তৈরি করার চেষ্টা আরও জোরদার করেছে জার্মানি। নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এগোচ্ছেন জার্মানির বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে Stellarator প্রযুক্তি। ফিউশন হল সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সূর্যের ভিতরে শক্তি উৎপন্ন হয়। অত্যন্ত বেশি তাপমাত্রা ও চাপে হাইড্রোজেনের মতো হালকা পরমাণু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন পরমাণু তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। পৃথিবীতেও একই ধরনের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
তবে ফিউশন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণ করা। ফিউশনের জন্য প্লাজমাকে কয়েক কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করতে হয়। এতটা উত্তপ্ত পদার্থকে কোনও যন্ত্রের দেওয়ালের সংস্পর্শে আসতে দেওয়া যায় না। তাই শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
Stellarator হল বিশেষ ধরনের ফিউশন মেশিন। এতে একাধিক শক্তিশালী চৌম্বকীয় কয়েল ব্যবহার করা হয়। এই কয়েলগুলি এমন একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, যার মাধ্যমে অতি উত্তপ্ত প্লাজমাকে মেশিনের মাঝখানে আটকে রাখা সম্ভব হয়। জার্মানির Wendelstein 7-X মেশিন ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। ২০২৫ সালে এই মেশিনে প্লাজমার তাপমাত্রা প্রায় ৩ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। একটি পরীক্ষায় প্রায় ৪৩ সেকেন্ড ধরে প্লাজমা ধরে রাখাও সম্ভব হয়েছিল।
জার্মান সংস্থা Proxima Fusion, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা ফিজিক্সের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সংস্থার প্রথম বড় প্রকল্পের নাম Alpha। মিউনিখের কাছে গার্চিংয়ে এই মেশিন তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। Alpha প্রকল্পের লক্ষ্য হল Stellarator প্রযুক্তির মাধ্যমে ফিউশন ঘটিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছনো, যেখানে ব্যবহৃত শক্তির তুলনায় বেশি শক্তি পাওয়া সম্ভব হয়। এই প্রকল্পে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো খরচ হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। এর পরের ধাপে Stellaris নামে একটি ফিউশন পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাভারিয়ার গুন্ড্রেমিঙ্গেনের একটি পুরনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গাকে এই প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য, ফিউশন থেকে উৎপন্ন শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা।
ফিউশন প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে জার্মান সরকারও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমান মেয়াদে ফিউশন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট কাজে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ইউরো খরচ করা হবে। তবে ফিউশন থেকে সরাসরি বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও সহজ নয়। প্লাজমাকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ করা, অত্যন্ত বেশি তাপ থেকে যন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখা এবং ফিউশন থেকে পাওয়া শক্তিকে কার্যকরভাবে বিদ্যুতে রূপান্তর করা—সবই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিজ্ঞানীরা এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারলে ভবিষ্যতে ফিউশন বিপুল পরিমাণ কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। জার্মানির লক্ষ্য এখন ফিউশন গবেষণাকে গবেষণাগারের পরীক্ষার পর্যায় থেকে বাস্তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নিয়ে যাওয়া।