
আপনার বাড়ির আলমারির কোণায় বা ড্রয়ারে ধুলো মেখে পড়ে থাকা পুরোনো স্মার্টফোন বা ল্যাপটপটাকে কী ভাবেন? বাতিল ইলেকট্রনিক জঞ্জাল? ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন নয়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে দেখলে, এগুলো আসলে এক একটা চলন্ত খনি। সোজা কথায়, আমাদের ঘরে ঘরেই জমে আছে 'রেয়ার-আর্থ ম্যাগনেট'-এর বিশাল ভান্ডার। আজকের দিনে যুদ্ধবিমান, মিসাইল, আধুনিক প্রযুক্তি বা চিকিৎসার সরঞ্জামের জন্য এই বিশেষ ধরনের চুম্বক এবং খাঁটি ধাতু অপরিহার্য। তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই পুরোনো গ্যাজেটগুলো থেকে সেই সম্পদ বৈজ্ঞানিকভাবে বের করে আনা।
এক কথায়, হ্যাঁ। পুরোনো ফোন বা ল্যাপটপের ভিতরে থাকা চুম্বকগুলো সাধারণ চুম্বক নয়। এগুলোকে বলে রেয়ার-আর্থ ম্যাগনেট। যুদ্ধবিমান, মিসাইল, ইলেকট্রিক গাড়ি এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটে এই চুম্বক ব্যবহার করা হয়। নিওডিমিয়াম, স্যামারিয়ামের মতো রেয়ার-আর্থ মৌল দিয়ে তৈরি হওয়ায় এই চুম্বকগুলো সাধারণ লোহার চুম্বকের চেয়ে আকারে অনেক ছোট কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।
গ্রেটার নয়ডা-র রিসাইক্লিং বিভাগের প্রধান সৈয়দ গজনফর আব্বাস সাফভি ইন্ডিয়া টুডে-কে জানিয়েছেন, সাধারণ খনি থেকে এক টন পাথর খুঁড়ে যেখানে ১ থেকে ২ কেজি কোবাল্ট পাওয়া যায়, সেখানে এক টন পুরোনো ব্যাটারি থেকে ৫০ থেকে ৮০ কেজি কোবাল্ট উদ্ধার করা সম্ভব। অর্থাৎ, প্রায় ৪০ গুণ বেশি!
ভারতের কেরালা এবং ওড়িশার উপকূলে মোনাজাইট বালির বিশাল ভান্ডার রয়েছে, যা রেয়ার-আর্থ খনিজের উৎস। তা সত্ত্বেও, ভারতকে কাঁচা বালি বিদেশে রপ্তানি করে চড়া দামে তৈরি চুম্বক আমদানি করতে হয়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ রেয়ার-আর্থ মিনারেল পরিশোধন করে চীন। তাই ই-ওয়েস্ট বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে এই ধাতুগুলো উদ্ধার করতে পারলে এই ক্ষেত্রে চীনের একাধিপত্যকে ভারত বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে। এর জন্য অবশ্যই উন্নত ও নিরাপদ বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো প্রয়োজন। ভারতীয় ল্যাবরেটরিতে ৯০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় 'অ্যাটোমিক রিসেট' পদ্ধতির মাধ্যমে এই চুম্বকগুলোকে ৯৯.৯ শতাংশ খাঁটি করা সম্ভব।
রিসাইক্লিং কীভাবে ভারতের শক্তি বাড়াতে পারে?
তবে এই পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতে পরিশোধিত ধাতব রাসায়নিকের অভ্যন্তরীণ বাজার এখনও তেমন বড় নয়। তাছাড়া, রিসাইকেল করা ধাতু দিয়ে নতুন করে ব্যাটারি সেল তৈরির মতো বড় কারখানা দেশে কম থাকায়, উদ্ধার করা কাঁচামাল প্রায়শই বিদেশে রপ্তানি করতে হয়। ভারতের আসল লক্ষ্য হলো, পুরোনো ডিভাইস থেকে পাওয়া এই মূল্যবান উপাদানগুলো দেশের মধ্যেই ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করা। তাই পরেরবার পুরোনো ফোন ফেলে দেওয়ার আগে মনে রাখবেন, ওটা শুধু জঞ্জাল নয়, দেশের জন্য এক বিরাট সম্পদ।