
মহাকাশবিজ্ঞানে নতুন চমক! এই প্রথম এমন এক নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যা মানুষের চোখে সবুজাভ রঙের বলে মনে হবে। নক্ষত্রটির নাম WD J1330+6435। এটি আসলে একটি শ্বেত বামন (White Dwarf)—অর্থাৎ জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর কোনও নক্ষত্রের পড়ে থাকা অত্যন্ত ঘন অবশিষ্টাংশ। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৮০ আলোকবর্ষ দূরে, ড্রাকো নক্ষত্রমণ্ডলে রয়েছে এই অদ্ভুত নক্ষত্রটি। সাধারণত নক্ষত্রের রং নির্ভর করে তার তাপমাত্রার উপর। তুলনামূলক ঠান্ডা নক্ষত্রকে কমলা বা লালচে দেখায়, সূর্যের মতো নক্ষত্র সাদা বা হলদেটে দেখাতে পারে, আর অত্যন্ত উত্তপ্ত নক্ষত্রের রং হয় নীলাভ। কিন্তু এই নতুন আবিষ্কার দেখাচ্ছে, নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে থাকা রাসায়নিক উপাদানও তার রং বদলে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, WD J1330+6435-এর অস্বাভাবিক রঙের পিছনে রয়েছে তার চারপাশের গ্রহমণ্ডলের পাথুরে ধ্বংসাবশেষ। একসময় নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করা গ্রহ বা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর ভেঙে যাওয়া অংশ তার মধ্যে প্রবেশ করেছে। এর ফলে নক্ষত্রটির বাইরের স্তরে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম ও লিথিয়ামের মতো উপাদানের উপস্থিতি বেড়েছে। বিশেষ করে সোডিয়ামের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত ঘন হওয়ায় সেখানে সোডিয়াম পরমাণুর সঙ্গে আশপাশের হিলিয়ামের মিথস্ক্রিয়া ঘটে। এর ফলে সোডিয়াম সাধারণ পরিস্থিতির তুলনায় আলোর আরও বিস্তৃত অংশ শোষণ করতে পারে। হলুদ, কমলা ও লাল আলোর একটি বড় অংশ শোষিত হওয়ায় নক্ষত্রটির আলো সবুজাভ আভা ধারণ করে। তবে এটি উজ্জ্বল, গাঢ় সবুজ নয়। বিজ্ঞানীরা এর রংকে ‘চার্টরুজ’ (Chartreuse) বলে বর্ণনা করেছেন—যা হলুদ ও সবুজের মাঝামাঝি একটি বিশেষ রং।
নক্ষত্রটিকে সরাসরি কাছ থেকে দেখে তার রং নির্ধারণ করেননি গবেষকরা। তাঁরা নক্ষত্র থেকে নির্গত আলোর বর্ণালি বা স্পেকট্রাম বিশ্লেষণ করেছেন। এরপর মানুষের চোখে সেই আলো কী রকম দেখাবে, তা কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে হিসাব করা হয়েছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে RAS Techniques and Instruments পত্রিকায়। গবেষণায় মোট ১৫১টি শ্বেত বামনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, এই ধরনের নক্ষত্রের রং শুধু সাদা নয়—রাসায়নিক গঠনের উপর নির্ভর করে গোলাপি, বেগুনি, হলুদ, নীলাভ এবং সবুজাভও হতে পারে।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে এসেছে। কার্বনসমৃদ্ধ কিছু শ্বেত বামনকে গোলাপি বা বেগুনি দেখাতে পারে। আবার যেসব শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে গ্রহাণু বা অন্য গ্রহীয় বস্তুর ধ্বংসাবশেষ জমা হয়েছে, সেগুলি হলুদাভ হতে পারে। হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মিশ্রণ থাকা অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা শ্বেত বামনের রং নীলাভও হতে পারে। বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার নক্ষত্রের রং সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে আরও বিস্তৃত করল। পাশাপাশি, কোনও নক্ষত্রের বায়ুমণ্ডলে কী কী উপাদান রয়েছে এবং তার বিবর্তনের সময় কী ঘটেছে, তা বোঝার নতুন পথও খুলে দিল।