
উত্তরাখণ্ডের হিমালয় অঞ্চলের ভূগর্ভে ক্রমাগত জমা হচ্ছে বিপুল ভূতাত্ত্বিক চাপ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে থাকা একটি বড় অংশ শক্তভাবে আটকে রয়েছে। ফলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১০০ বছরে সেখানে প্রায় ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্পে নির্গত শক্তির সমপরিমাণ শক্তি জমা হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট ১০০ বছর অন্তর ভূমিকম্প হবেই।
উত্তরাখণ্ডের নীচে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষস্থলে রয়েছে ‘মেন হিমালয়ান থ্রাস্ট’ (Main Himalayan Thrust বা MHT)। এই ভূগর্ভস্থ চ্যুতির উপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এর একটি বড় অংশ আটকে রয়েছে। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত ইউরেশীয় প্লেটের দিকে এগোলেও সেই গতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চ্যুতির বরাবর স্বাভাবিকভাবে সরে যেতে পারছে না। ফলে ভূগর্ভের শিলাস্তরে স্থিতিস্থাপক চাপ জমা হচ্ছে। গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, এই আটকে থাকা অংশটির বিস্তার প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। প্রতি বছর প্লেটের প্রত্যাশিত গতি ও চ্যুতির প্রকৃত সরে যাওয়ার মধ্যে ঘাটতি প্রায় ১৮ মিলিমিটার।
গবেষকেরা গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (GNSS)-এর তথ্য এবং জাপানের ALOS-2 উপগ্রহের রাডার পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেছেন। সেই তথ্য থেকে ভূ-পৃষ্ঠের নড়াচড়া ও উচ্চতার পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গিয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভূ-পৃষ্ঠের কিছু অংশ বছরে প্রায় ৪ থেকে ৬ মিলিমিটার পর্যন্ত উপরের দিকে উঠছে। এই তথ্যও ভূগর্ভে জমা হওয়া চাপের ধারণাকে সমর্থন করে।
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, উত্তরাখণ্ডের নীচে জমা হওয়া শক্তির পরিমাণ প্রতি শতাব্দীতে আনুমানিক ৮.১ মাত্রার একটি বড় ভূমিকম্পে নির্গত শক্তির সমতুল্য হতে পারে। কিন্তু গবেষণাটি কোথাও বলেনি যে শীঘ্রই ৮.১ মাত্রার ভূমিকম্প হবে। ভূমিকম্প ঠিক কবে হবে, তার মাত্রা কত হবে কিংবা কতটা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকম্পের ঝুঁকি সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন।
উত্তরাখণ্ড মধ্য হিমালয়ের এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে গত ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বড় ভূমিকম্পের মাধ্যমে চ্যুতির উল্লেখযোগ্য অংশের সঞ্চিত চাপ মুক্ত হয়নি বলে গবেষকেরা মনে করছেন। এই কারণেই অঞ্চলটিকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উত্তরাখণ্ডের পাশাপাশি সংলগ্ন ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমির ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলির জন্যও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পের সঠিক সময় অনুমান করা সম্ভব না হলেও, ভূমিকম্প-সহনশীল পরিকাঠামো তৈরি এবং বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিচ্ছে এই গবেষণা।