
চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে বিপর্যয়ের ঘটনায় তদন্ত আরও জোরদার করল পুলিশ। এ বার ধৃত দুই ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু এবং কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করতে চান তদন্তকারীরা। বিপর্যয়ের আগে ও পরে মাইকে কী ঘোষণা করা হয়েছিল, ঠিক কখন সেই ঘোষণা করা হয় এবং কার নির্দেশে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলা হয়েছিল, তা স্পষ্ট করতে চাইছে পুলিশ। কারণ, মাইকে ঘোষণা ও বিপর্যয়ের সময়ের মধ্যে যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে এখনও বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোয় মাইকে ঘোষণার মূল দায়িত্বে ছিলেন সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। বিপর্যয়ের পর মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা করার অভিযোগে প্রথমে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে শুক্রবার সকালে গ্রেফতার হন অপর ঘোষক কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়া।
তদন্তকারীদের হাতে ইতিমধ্যে ঘোষণা সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য এসেছে। এ বার দুই ঘোষকের বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল খতিয়ে দেখতে চাইছে পুলিশ। বিশেষ করে বিপর্যয়ের ঠিক আগে ও পরে কী ঘটেছিল, কখন মাইকে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সেই ঘোষণার নেপথ্যে কার নির্দেশ ছিল, তা জানতে চান তদন্তকারীরা।
সূত্রের খবর, এই কারণেই সেন্টু ও কালিয়াকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শনিবার ব্যাঙ্কশাল আদালত কালিয়াকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
কালিয়ার গ্রেফতারির খবর প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর ফেসবুক হ্যান্ডল থেকে একাধিক পোস্ট করা হয়। সেখানে হাতে লেখা একটি নোটের ছবিও পোস্ট করা হয়। ওই নোটে কুশল দাবি করেন, বিপর্যয়ের কিছুক্ষণ আগে তিনি ক্লাবে গিয়েছিলেন। সেই সময় সেখানে গিরিশ পার্ক থানার ‘বড়বাবু’ ও ‘ছোটবাবু’ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা চা খেতে চাইলে তিনি এবং ক্লাবের অন্য এক সদস্য চা আনতে যান।
কুশলের দাবি, চা দেওয়ার পর তাঁরা ক্লাবঘরে বসে নিজেদের কাজ করছিলেন। প্রায় ১০-১৫ মিনিট পরে একটি শব্দ শুনতে পান। সেই শব্দ শুনে থানার বড়বাবু ও ছোটবাবু ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যান।
এর পর ক্লাবের সম্পাদকের ছেলে কবির এসে তাঁকে জানান, মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। কুশলের দাবি, তিনি যখন বাইরে বেরোতে যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশের এক কর্মী তাঁদের মাইকে ঘোষণা করতে বলেন। সামনে গিয়ে তিনি দেখেন, যিনি মাইকিং করছিলেন, তিনি সেখানে নেই। ফলে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তাঁকেই ঘোষণা করতে হয় বলে দাবি করেছেন কুশল।
তবে কুশলের এই বক্তব্যের সত্যতা বা ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক এখনও তদন্তসাপেক্ষ। তাঁর দাবি যাচাই করে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর সমাজমাধ্যমে একাধিক ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ে। যদিও সেই ভিডিয়োগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। একটি ভিডিয়োয় মাইকে ‘মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে’ বলে ঘোষণা করতে শোনা যায়। সেই সঙ্গে দর্শনার্থীদের দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছিল।
অভিযোগ, এই ঘোষণা শুনে দর্শনার্থীদের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। পরবর্তী সময়ে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসে। আহত হন আরও অনেকে।
তবে মাইকে ঘোষণার সঙ্গে বিপর্যয় ও পদপিষ্টের ঘটনার সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক কী, আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষেত্রে ওই ঘোষণার ভূমিকা কতটা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সেই কারণেই ঘোষণার সময়, পরিস্থিতি এবং নির্দেশদাতার পরিচয় জানতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ।
অন্য দিকে, চোরবাগানের ঘটনায় আহতদের তালিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সোনারপুরের বাসিন্দা সুদীপ্ত হালদার শনিবার চোরবাগানে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর দাবি, বিপর্যয়ে আহত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দুই বোনের নাম আহতদের তালিকায় নেই।
বোনেদের চিকিৎসার জন্য সরকারি সাহায্য পাওয়ার আশায় এ দিন চোরবাগান মণ্ডপে পৌঁছন তিনি। পুলিশের কাছে দুই বোনের নাম ও প্রয়োজনীয় নথিও জমা দেন সুদীপ্ত।
এক দিকে বিপর্যয়ের নেপথ্যে কী ঘটেছিল, তা জানতে দুই ঘোষককে জেরা করার প্রস্তুতি চলছে। অন্য দিকে, আহতদের তালিকা ও সরকারি সহায়তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। সব মিলিয়ে চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তে একাধিক দিক খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.