
কলকাতার একাধিক পরিচিত রাস্তার নাম কি এবার বদলাতে চলেছে? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গঠিত ১০ সদস্যের একটি কমিটি রাজ্যের বিভিন্ন রাস্তা, সেতু এবং জায়গার নাম পরিবর্তনের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সম্ভাব্য নাম বদলের তালিকায় রয়েছে লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণি। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত কোন কোন রাস্তা বা জায়গার নাম পরিবর্তন করা হবে, তা নির্ধারিত হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কমিউনিস্ট নেতাদের নামের রাস্তার ভবিষ্যৎ এখন আলোচনায়।
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য নাম পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে—
এই তিন রাস্তার নামই আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের স্মরণে রাখা হয়েছে। লেনিন ও কার্ল মার্কসের পাশাপাশি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতা হো চি মিনের নামও কলকাতার রাস্তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত।
রাজ্য সরকারের তৈরি ১০ সদস্যের কমিটি কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাস্তা, সেতু ও জনস্থানের নাম নিয়ে পর্যালোচনা করছে। কোন নাম ঐতিহাসিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে নাম পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখনও কোনও নাম চূড়ান্তভাবে পরিবর্তন করা হয়নি। কমিটির সুপারিশের পরই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। স্বামী প্রদীপ্তানন্দের (কার্তিক মহারাজ) নেতৃত্বাধীন এই উপদেষ্টা কমিটি দুর্গাপুজোর পর তাদের প্রথম বৈঠক করবে এবং সেখানে প্রথম ধাপে কলকাতার রাস্তাগুলোর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে বলে জানা গেছে। এই প্যানেলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত এবং কলকাতা পৌর নিগমের কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। কার্তিক মহারাজ বলেন, “হো-চি-মিন সরণি, লেনিন সরণি এবং কার্ল মার্কস সরণির নতুন নাম রাখা হবে। অন্যান্য রাস্তার নাম পরিবর্তনের জন্যও প্রস্তাব এসেছে।” তিনি আরও বলেন, “সদস্যরা ভারতীয় ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বদের (যাদের নামে রাস্তাগুলোর নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে) প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করবেন। আমাদের সুপারিশগুলো বিধানসভায় পাঠানো হবে।”
তথাগত রায় বলেছেন, "লেনিন ও মার্কসের নামে থাকা রাস্তাগুলোর নাম অবশ্যই পরিবর্তন করা হবে। আমার প্রস্তাব হল গণিতবিদ ও ভারতীয় জনসংঘের সভাপতি দেবপ্রসাদ ঘোষের নামে ‘লেনিন সরণি’-র নামকরণ করা হোক। আমি কমিটির কাছে এই প্রস্তাব পেশ করব। খিদিরপুরের ‘কার্ল মার্কস সরণি’-র নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে রাখা যেতে পারে। কারণ ওই এলাকাতেই এই দুই কবির বাড়ি।” তিনি আরও বলেন, ‘হো-চি-মিন সরণি’-র নাম পরিবর্তন করে মার্টিন লুথার কিং-এর নামে রাখা উচিত। আমেরিকানদের ক্ষ্যাপানোর জন্যই ওই রাস্তাটির নাম হো চি মিনের নামে রাখা হয়েছিল, কারণ ওই রাস্তাতেই তাদের কনস্যুলেট অবস্থিত। রাস্তাটির নাম মার্টিন লুথার কিং-এর নামে রাখা হলে আমরা তাঁকে সম্মান জানানো হবে। একই সঙ্গে, বামপন্থীদের করা সেই ভুল পদক্ষেপেরও সংশোধন করা হবে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, জওহরলাল নেহরু রোড ও সিধো-কানহো দাহারের সংযোগস্থলে থাকা লেনিনের মূর্তি অবশ্যই সরিয়ে ফেলতে হবে। তিনি বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম সর্দার প্যাটেলের নামে রাখা উচিত।”
উল্লেখ্য, ভ্লাদিমির লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সময় ১৯৭০ সালে ধর্মতলা স্ট্রিটের নাম পরিবর্তন করে ‘লেনিন সরণি’ রাখা হয়েছিল। পরের বছর, ‘সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোড’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কার্ল মার্কস সরণি’ রাখা হয়। তথাগত রায় বলেন, যেসব রাস্তা বা স্থানের নাম সাম্প্রদায়িক মুসলিমদের নামে রয়েছে, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করে জাতীয়তাবাদী মুসলিমদের নামে রাখা উচিত। তিনি বলেন, “বারাসতের যে বাসস্ট্যান্ডটির নাম তিতুমীরের নামে রয়েছে, সেটির নাম পরিবর্তন করে প্রাবন্ধিক কাজি আব্দুল ওদুদ, শিক্ষাবিদ বেগম রোকেয়া কিংবা লেখক এস ওয়াজেদ আলির নামে রাখা যেতে পারে।”
কলকাতার বহু রাস্তার নামের সঙ্গে শহরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। লেনিন সরণি, কার্ল মার্কস সরণি এবং হো চি মিন সরণিও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব সামনে আসায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বনাম বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার প্রশ্নও সামনে আসছে। এই মুহূর্তে কমিটি নাম নিয়ে আলোচনা করছে। চূড়ান্ত সুপারিশ না হওয়া পর্যন্ত কোনও নাম পরিবর্তন নিশ্চিত নয়। কমিটির রিপোর্টের পরই রাজ্য সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ করবে। কলকাতার ঐতিহাসিক রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ তাই আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি ও নাগরিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.