
তৃণমূলের ভেতরে যখন একের পর এক নেতা দল ছাড়ছেন, সংগঠন টালমাটাল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর সংকেত দিলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসন্ন ২১ জুলাই ধর্মতলায় বড় জমায়েতের ডাক দিয়ে দলের কর্মীদের মনোবল ফেরানোর চেষ্টা করলেন তৃণমূল নেত্রী।
বৃহস্পতিবার উত্তর কলকাতা তৃণমূলের জেলা সভাপতি কুণাল ঘোষের উদ্যোগে রামমোহন লাইব্রেরিতে একটি কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফোনের মাধ্যমে টানা ১২ মিনিট বক্তব্য রাখেন মমতা। কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, '২১ জুলাই আশা করি অনুমতি পাব। সে দিন বিস্তারিত বলব। পাঁচ জন কর্মী থাকলেও ওই মিটিংয়ে থাকব।' তাঁর এই বার্তা শুধু উত্তর কলকাতার কর্মীদের জন্য নয়, রাজনৈতিক মহলের মতে এটি আসলে গোটা রাজ্যের তৃণমূল সংগঠনের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক সংকেত।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে হাই কোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে ২১ জুলাইয়ের সভা আয়োজনের অভিযোগে ইতিমধ্যেই জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। সেই মামলায় মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এই আইনি জটিলতার মধ্যেই সমাবেশের প্রস্তুতির ঘোষণা করে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয়তার বার্তা দিলেন মমতা।
বাম আমলে বিরোধী পরিসরে থাকাকালীনও ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ ছিল তৃণমূলের শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। কিন্তু দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর এখন ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূল নেতৃত্বের একটা বড় অংশ দল থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে এ বার কতজন সেই ডাকে সাড়া দেবেন, তৃণমূল স্তরের কর্মীদের মধ্যে মমতা-আবেগ এখনও কতটা জীবন্ত, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কর্মিসভায় দলত্যাগীদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দেন মমতা। তিনি বলেন, 'কেউ কেউ নিজেকে বাঁচাতে, পরিবার বাঁচাতে বেইমানি করেছে। মা যখন অসুস্থ, তখন তাকে দেখবেন না?' এই কথা বলামাত্র হাততালিতে ভরে ওঠে রামমোহন লাইব্রেরি। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারিও দেন তিনি, বলেন যাঁদের সুবুদ্ধি আছে তাঁরা ফিরে আসুন, আর যাঁরা ভাবছেন এ ভাবেই চলবেন তাঁরা শেষ পর্যন্ত না ঘর কা না ঘাট কা হয়ে থাকবেন।
পরিবারের উপর চাপের কথাও তুলে ধরেন মমতা। তিনি জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়মিত আদালতে যেতে হচ্ছে, প্রতিদিন সিআইডি ও ইডি-র তলব আসছে। এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করেন তিনি।
বিধানসভায় পরিষদীয় দল ভাঙার ঘটনায় যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেই উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ও বর্তমান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেও তীব্র আক্রমণ করেন মমতা। নাম না নিয়ে তিনি বলেন, 'বিজেপি স্পনসর্ড সিপিএমের নেতা। তবে সিপিএম একটা কাজ ভাল করেছিল, এটাকে বহিষ্কার করেছিল।' পাল্টা জবাবে ঋতব্রত বলেন, কুণাল ঘোষ যদি তাঁকে চারআনার নকুলদানা বলে থাকেন, তা হলে নেত্রী তাঁকে নিয়ে এত সময় নষ্ট করছেন কেন?
সব মিলিয়ে ২১ জুলাইয়ের এই সমাবেশ এখন শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি হয়ে উঠছে ক্ষমতা হারানোর পর মমতার নেতৃত্বের পরীক্ষাও। সমাবেশের ভিড়ই বলে দেবে, তৃণমূলের শিকড় এখনও কতটা শক্ত।