একসময় টাটা ন্যানো প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তাল হয়েছিল সিঙ্গুর। সেই আন্দোলনের জেরে বাংলার রাজনীতিতে পালাবদলও ঘটে। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান হয়। ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল কংগ্রেস। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। কেটেগেছে ১৫ বছর। কিন্তু এখন কী ভাবছে সিঙ্গুরবাসী।
বিধানসভা ভোটের আগে সেই সিঙ্গুরের কৃষকরাই এখন বলছেন, তাঁরা শিল্পের বিরোধী নন। চাকরির সুযোগ তৈরি হলে শিল্পকে স্বাগত। তবে তাঁদের একটাই শর্ত— উর্বর, বহুফসলি চাষের জমিতে কোনও কারখানা করা চলবে না। যা করার, অনুর্বর জমিতেই করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে হুগলি জেলার সিঙ্গুর শহর এবং তার আশেপাশের এলাকার কৃষকরা নীতিগতভাবে শিল্পায়নকে সমর্থন করছেন। তবে তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, হাজার হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা যে উর্বর চাষের জমির ওপর নির্ভরশীল, তাতে কোনওভাবেই হাত দেওয়া চলবে না।
২০১১ সালে সিঙ্গুর ইস্যু
সিঙ্গুর ইস্যু রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছিল। টাটা ন্যানো কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তীব্র আন্দোলন হয়েছিল এখানে। সেই আন্দোলনের জেরেই ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টও এই জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
সিঙ্গুরের বিজেপি প্রার্থী অরূপ কুমার দাস বলেন, "আমরা (বিজেপি) জিতলে শিল্প আনার চেষ্টা করব... এখানকার প্রায় প্রত্যেক পরিবার থেকে অন্তত একজন কাজের জন্য বাইরে যান। এখানে কাজের সুযোগ তৈরি হলে মানুষ এখানেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ পাবে। চাকরির জন্য আর বাইরে যেতে হবে না। মমতা সরকারের এখানে শিল্প গড়ার কোনও ইচ্ছাই ছিল না... সিঙ্গুরে অনেক ফাঁকা জমিও রয়েছে, যেখানে আমরা শিল্প গড়ব যাতে মানুষের কর্মসংস্থান হয়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমাদের লক্ষ্য এখানকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করা। একই সঙ্গে, যারা এখানে পড়াশোনা করবে, তারা যেন এলাকাতেই শিল্পের মাধ্যমে কাজের সুযোগ পায়। আমরা (বিজেপি) সিঙ্গুরের স্বাস্থ্য পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যা মেটাতেও কাজ করব। আমি এখানে কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি এবং নিউরোলজির মতো বিভাগ-সহ একটি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি করব, যাতে চিকিৎসার জন্য মানুষকে আর কলকাতা ছুটতে না হয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য এবং নারী সুরক্ষাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।"
অরূপ দাস আরও জানান, তিনি এলাকায় একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, একটি সেন্ট্রাল স্কুল এবং একটি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী তথা সিঙ্গুরের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বেচারাম মান্না বলেন, আগের আন্দোলন শিল্পের বিরুদ্ধে ছিল না। "আমাদের আন্দোলন টাটা বা কোনও শিল্পের বিরুদ্ধে ছিল না। আন্দোলন ছিল উর্বর জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে, কৃষকদের জোর করে জমি দিতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে," বলেন তিনি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি যোগ করেন, "গত ১১ বছরে আমাদের সরকার অনেক কাজ করেছে। আপনি যদি জাতীয় সড়ক (NH2) এবং দিল্লি রোডের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন অনেক ছোট-বড় শিল্প গড়ে উঠেছে।"
স্থানীয় নেতা দুধ কুমার ধারা, যিনি ২০০৬ সালের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি বলেন, "সিঙ্গুর আন্দোলন ছিল কৃষকদের আন্দোলন। কৃষকদের মূল দাবি ছিল বহুফসলি জমি নিয়ে। আমাদের দাবি, এই উর্বর জমি নষ্ট করা যাবে না। এখানকার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চাষ হয়, বাকি ৭০ শতাংশ অনুর্বর। আমরা অনুর্বর জমিতে শিল্পকে স্বাগত জানাই, কিন্তু চাষের জমিতে নয়।"
পূর্ব পাড়া গ্রামের কৃষকরাও একই সুরে কথা বলেছেন। প্রসেনজিৎ দাস বলেন, "উর্বর জমিতে কারখানা হলে আমাদের জীবন-জীবিকার ওপর খারাপ প্রভাব পড়বে। আমরা শিল্পকে স্বাগত জানাই, কিন্তু তা শুধু অনুর্বর জমিতেই হোক।"
শ্রীকান্ত মান্না বলেন, "আমাদের সরকার ৯০ শতাংশ জমি ফিরিয়ে দিয়েছে। আমরা শিল্পের বিরোধী নই, উন্নয়নেরও বিরোধী নই। কিন্তু চাষের জমিতে শিল্প গড়া উচিত নয়।"
পীযূষ কান্তি ঘোষ বলেন, "আমরা চাই, আমাদের জমি চাষ এবং শিল্প— দু'য়ের জন্যই ব্যবহৃত হোক। কারণ এতে আমাদের পরিবারের যুবকদের চাকরি হবে এবং এলাকার উন্নয়ন হবে।"
তিনি আরও বলেন, "আন্দোলনের সময়েও এটাই আমাদের অবস্থান ছিল, আজও আমরা একই কথা বলছি। আমরা কোনও শিল্পের বিরোধী নই। তবে আমাদের চাষের জমিতে, বিশেষ করে উর্বর জমিতে শিল্প গড়া যাবে না। সেই জমি যেমন আছে, তেমনই থাকা উচিত। যেখানে চাষ হয় না, সেখানে শিল্প হলে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। ভোটের প্রার্থীদের আমরা আমাদের মতামত জানিয়েছি, আমাদের আন্দোলনের নেতারাও এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন।"
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.