
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া অনুযায়ী, নির্বাচনের দু’দিন আগে পর্যন্ত ট্রাইবুনাল যে বিচারানাধীন ভোটারদের নাম তালিকায় তোলার ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেবে, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। এই নির্দেশ এখন ভোটকর্মীদের বেশ বিপাকে ফেলেছে। ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তির নাম আপিল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নির্দিষ্ট সময়সীমার (২১ ও ২৭ এপ্রিল) মধ্যে অনুমোদন পাবে, তাঁরা ২৩ ও ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে চলা এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচনী প্রস্তুতির কাজে যুক্ত আধিকারিকরা বলছেন, বিষয়টি বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি করছে। কারণ ভোটার তালিকার 'চিহ্নিত কপি' (marked copy) সাধারণত অনেক আগেই প্রস্তুত করে রাখা হয়।ভোটগ্রহণের দু'দিন আগে (নির্বাচনী পরিভাষায় যাকে 'P-2 দিন' বলা হয়) যদি ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করা হয়, তবে আমাদের কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হবেতা বুঝতে হলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
কোনও একটি বুথে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের জন্য প্রথম কাজই হল ভোটার তালিকার চিহ্নিত কপিটি প্রস্তুত করা। আর এই কাজটি সাধারণত ভোটগ্রহণের পাঁচ দিন আগেই সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। বুথগুলোতে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই 'চিহ্নিত ভোটার তালিকা'টি সাধারণত ভোটগ্রহণের পাঁচ দিন আগেই জেলা নির্বাচন আধিকারিকের (DEO) কার্যালয়ে প্রস্তুত করা হয়। এরপর ভোটগ্রহণের চার দিন আগে এটি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই চিহ্নিত তালিকার মাধ্যমে মূলত সেইসব ভোটারের নাম চিহ্নিত করা থাকে, যাঁরা ইতিমধ্যেই 'পোস্টাল ব্যালট'-এর মাধ্যমে তাঁদের ভোট দিয়েছেন। কিংবা যাঁরা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে নির্ধারিত দিনের আগেই তাঁদের ভোট দিয়ে ফেলেছেন। বুথগুলোতে ভোটগ্রহণের সুবিধার্থে ভোটকর্মীদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এই চিহ্নিত তালিকাটিকে অন্যান্য নির্বাচনী সরঞ্জাম—যেমন ইভিএম (EVM)—এর সঙ্গে একটি ব্যাগের মধ্যে ভরে রাখা হয়।
দার্জিলিং, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে ২০০-রও বেশি বুথ রয়েছে। এসব জেলায় ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা দলটিকে (যাতে একজন প্রিসাইডিং অফিসার এবং চারজন পোলিং অফিসার থাকেন) ভোটগ্রহণের দুদিন আগেই নিজেদের কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হয় এবং ভোটগ্রহণের ঠিক আগের দিন সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছতে হয়। আর ঠিক এই কারণেই, 'P-3 দিন' অর্থাৎ ভোটগ্রহণের তিন দিন আগের সন্ধ্যার মধ্যেই এই ব্যাগগুলো প্রস্তুত করে রাখা হয়। ভোটকর্মীরা বলছেন, এখন যদি ভোটগ্রহণের মাত্র দু'দিন আগে ভোটার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে ভোটার তালিকার চিহ্নিত কপিটি প্রস্তুত করাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, অধিকাংশ ভোটগ্রহণকারী দল ভোটের একদিন আগে DCRC (বিতরণ ও গ্রহণ কেন্দ্র) থেকে ভোটের সরঞ্জাম-সহ ব্যাগ সংগ্রহ করে এবং নিজেদের বুথের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু এমন কিছু বুথ রয়েছে, যেখানে ভোটগ্রহণের তারিখের দু'দিন আগেই ভোটগ্রহণকারী দলগুলোকে পাঠিয়ে দিতে হয়। এই ক্ষেত্রে কী হবে? তাদের কাছে ভোটার তালিকার ‘চিহ্নিত কপি’ (marked copy) কীভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে?
গত ১২ এপ্রিল থেকে কলকাতার শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন (SPM-NIWAS)-এ মোট ১৯টি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে বিচার-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল সেই ২৭.১৬ লক্ষ ভোটারের মধ্যে কত'জনের নাম এই ট্রাইব্যুনালগুলোর দ্বারা পুনরায় অনুমোদন বা ছাড়পত্র পেয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রথম দফার নির্বাচনে ২৩ এপ্রিল যেসব ১৬টি জেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, সেই জেলাগুলোর জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন মোট বারোজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। এই জেলাগুলো থেকে ভোটার তালিকা থেকে মোট ১৪.২৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে যে, হিসাবটা বেশ পরিষ্কার। ওই সূত্রটি মন্তব্য করেছে, বাদ পড়া ১৪.২৮ লক্ষ নামের তালিকা থেকে নামগুলো যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া ওই বারোজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন ও শ্রমসাধ্য কাজ হবে। ভোটের কাজে যুক্ত আধিকারিকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন হল ২৩ এপ্রিলের ভোটের জন্য যদি ২১ এপ্রিল রাতে অতিরিক্ত তালিকাটি প্রকাশ করা হয়, তবে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যেসব ভোটারের নাম পুনরায় অনুমোদন পাবে, তাঁদের কাছে এই খবরের তথ্য কীভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে?
কারণ, ২২ এপ্রিল ভোটগ্রহণকারী দলগুলোকে বিভিন্ন বুথে পাঠানোর কাজে সমস্ত আধিকারিক ব্যস্ত থাকবেন। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ভোটারদের পক্ষে অনলাইনে নিজেদের নাম যাচাই করে নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। এমতাবস্থায়, ট্রাইব্যুনালগুলো কেবল যাদের নাম অনুমোদন দিয়েছে তাঁরা নয়—বরং তালিকা থেকে বাদ পড়া সেই সমস্ত ভোটারই যদি বুথে গিয়ে ভোট দেওয়ার দাবি জানাতে শুরু করেন, তখন কী পরিস্থিতি তৈরি হবে?
যদিও এনিয়ে কোনও সমস্যা হবে না বলেই দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল। তিনি বলেন,"নির্বাচন কমিশনকে সেতু বন্ধনের মতো একটা সফটওয়্যার তৈরি করতে হবে যেখানে নামের নিষ্পত্তি হতেই ভোটারদের নাম তালিকায় যুক্ত হতে থাকবে।" ভোটাররা জানবেন কীভাবে যে তিনি ভোট দিতে পারবেন? জবাবে মনোজ আগরওয়াল বলেন, "বিএলওদের দায়িত্ব রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। এছাড়া ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারবেন ভোটাররা, এছাড়া বিডিওর কাছেও সব তথ্য দেওয়া থাকবে।"
West Bengal News (পশ্চিমবঙ্গের খবর): Read In depth coverage of West Bengal News Today in Bengali including West Bengal Political, Education, Crime, Weather and Common man issues news at Asianet News Bangla.