হিন্দুধর্মের আদিতম ধর্মগ্রন্থ চার বেদ – ঋক্, সাম, যজুঃ ও অথর্ব। এগুলির মধ্যে ঋগ্বেদ প্রাচীনতম। ১৫০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে এই গ্রন্থগুলি রচিত হয়। পল্লব ও গুপ্তযুগ পর্যন্ত এগুলি গুরুশিষ্য পরম্পরায় মৌখিক প্রথার মাধ্যমে প্রচলিত ছিল। এর পর থেকে মৌখিক প্রথার সঙ্গে সঙ্গে লিপিবদ্ধ করার প্রথাও চালু হয়। সেই গ্রন্থতেও উল্লেখ ছিল এই চিহ্নের। হিন্দুদের দেব-দেবীগণ বৈদিক যুগ ও মধ্যযুগে নেপাল ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। হিন্দু দেবতা বলতে যোগশাস্ত্রের ইষ্টদেবতা, তেত্রিশ কোটি বৈদিক দেবতা বা শতাধিক পৌরাণিক দেবতাদের কথা বলা হয়। এদের মধ্যে মুখ্য দেবতারা পূজিত হন। প্রত্যেক দেবতার আলাদা আলাদা জটিল জটিল চরিত্রাবলী বিদ্যমান হলেও তাদেরকে অনেক সময়ই "ব্রহ্ম " নামে এক নিরাকার পরম সত্তার অংশবিশেষ বলে ধরা হয়। মুখ্য দেবতার উপাসকরা হিন্দুধর্মের ভিন্ন শাখাগুলির জন্ম দিয়েছেন যেমন শৈবমত, বৈষ্ণবমত ও শাক্তমত। 

আরও পড়ুন- বাড়িকে কু-নজর থেকে বাঁচাতে, মেনে চলুন বাস্তুর এই নিয়মগুলি

হিন্দু দেবতাদেরকে বিভিন্ন প্রতীক, যেমন  ছবি বা প্রতিমা পূজোর চল রয়েছে। কিছু  হিন্দু দর্শন যেমন  চার্বাকরা আবার নাস্তিক্যবাদী মনোভাব পোষণ করেছেন। তাঁদের মতে, দেবতা বা ঈশ্বরের ধারণাকে অস্বীকার করেছেন। আর্য সমাজ বা ব্রাহ্ম সমাজের মতো  ঊনবিংশ শতাব্দীর ধর্মমতগুলি একাধিক দেবতার ধারণাকে বাতিল করে  আব্রাহামীয় ধর্মগুলির মতই নিরাকার একেশ্বর-বিশ্বাসের পথে হেঁটেছেন। জৈনধর্ম বা বহির্ভারতীয় থাইল্যান্ড বা জাপানিজ বৌদ্ধ বিশ্বাসে হিন্দু দেবতাদের আরাধনা করার রীতি রয়েছে। তবে এমন বহু দেব-দেবী রয়েছেন যারা বহু পরিচিত হলেও বর্তমানে আর পূজিত হন না। 

বলরাম— বলদেব। এক সময়ে স্বতন্ত্রভাবে পূজিত হতেন। বলরাম হলেন হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের জ্যেষ্ঠভ্রাতা। তিনি বলদেব, বলভদ্র ও হলায়ুধ নামেও পরিচিত। বৈষ্ণবরা বলরামকে বিষ্ণুর অবতার-জ্ঞানে পূজা করেন। দ্বাপর যুগের শেষে বলরামের জন্ম হয় রোহিণীর গর্ভে। রোহিণী হলেন শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেবের আর এক পত্নী ও নন্দের ভগিনী । শ্রীহরি বিষ্ণুর আদিশেষ নাগের অবতার হলেন বলরাম।  বল মানে শক্তি। শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন হয়েছে বলে তার নাম বলরাম রাখা হয়। বর্তমানে পূজিত হন না ইনিও।

আরও পড়ুন- অগ্রহায়ণ মাস কেমন প্রভাব ফেলবে কর্কট রাশির উপর

ইন্দ্র— দেবরাজ, বজ্রের দেবতা। একজন হিন্দু বৈদিক দেবতা, হিন্দু পুরাণে স্বর্গের ও দেবতাদের রাজা। তাঁর রাণীর নাম শচীদেবী এবং হাতীর নাম ঐরাবত। তার বাহন পুষ্পক রথ। মূলত ইন্দ্র কোনও বিশেষ দেবতা নন, যিনি স্বর্গের রাজা হন তিনিই ইন্দ্র। ইন্দ্রের বিশেষ অস্ত্র হল বজ্র বা বিদ্যুৎ। আর্য সভ্যতার ইতিহাসবেত্তাদের মতে ইন্দ্র সম্ভবত ভারতে আগত আর্যদের মধ্যে কোনও এক রাজার নাম, যা কালক্রমে দেবতাদের রাজা আখ্যান পেয়েছে হিন্দুধর্মে। তবে ঋকবেদে ইন্দ্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারত অনুযায়ী ইন্দ্র অর্জুনের পিতা। পাণ্ডুপত্নী কুন্তী এক বলশালী পুত্রকামনা করে পুত্রেষ্টি মন্ত্রে ইন্দ্রকে আহ্বান করেন ও অর্জুনের জন্ম দেন।

কুবের— ধন-সম্পদের দেবতা। হিন্দু পুরাণ অনুসারে অর্ধদৈব যক্ষদের ঈশ্বরসম রাজা৷ তিনি দিকপাল হিসাবে বিবেচিত হন এবং উত্তরদিকের অধিষ্ঠাতা হিসাবে পূজিত হন৷ এছাড়া তিনি লোকপাল তথা জগতের সংরক্ষক হিসাবেও পূজিত হন৷ বিভিন্ন পৌরাণিক পুস্তকগুলি থেকে কুবেরকে একাধিক অর্ধদৈব শক্তির সংমিশ্রণ ও বিশ্বের সমস্ত ঐশ্বর্যের মালিক হিসাবে গণ্য করার উচ্চ প্রসংশনীয় বর্ণনা পাওয়া যায়৷  প্রাথমিকভাবে বৈদিক যুগে উল্লিখিত অসুরকুলের একজন অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসাবে কুবেরের কথা থাকলেও পৌরাণিক যুগে ও হিন্দু মহাকাব্য রচনকালে তিনিই হয়ে ওঠেন ধনদেবতা৷ পরবর্তীকালে তিনি অলকাপুরীতে নিজের রাজত্ব স্থাপন করেন, যা বর্তমান শ্রীলঙ্কার সিগিরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত৷ বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তকে কুবেরর ধনৈশ্বর্য ও তার আড়ম্বরের কথা উল্লেখ করা রয়েছে৷ বর্তমানে কুবেরের মূর্তি পুজো না হলেও কুবের যন্ত্র বিস্তার লাভ করছে।

আরও পড়ুন- বুধবার মেনে চলুন এই নিয়ম, কাটবে সাংসারিক সমস্যা ও ফিরবে সুখ সমৃদ্ধি

বরুণ— বৃষ্টি ও জলশক্তির দেবতা। বরুণ হিন্দু ধর্মের প্রধান দেবতা। প্রাচীন বৈদিক ধর্মের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয় যে বরুনের অবস্থান অন্যান্য বৈদিক দেবতাদের চেয়ে প্রাচীন। ঋগ্বেদের বেশিরভাগ শ্লোকে বরুণ, ইন্দ্র ইত্যাদি অন্যান্য দেবতার ও বর্ণনা করা হয়েছে। বরুণ সম্পর্কিত প্রার্থনাগুলি ভক্তি সম্পর্কিত ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন করে। উদাহরণস্বরূপ, ঋগ্বেদের সপ্তম ভাগে, বর্মনের জন্য সুন্দর প্রার্থনা গানের উল্লেখ রয়েছে। 

ব্রহ্মা— ইনি সৃষ্টিকর্তা রূপে পরিচিত। হিন্দুধর্মে সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মা। বিষ্ণু ও শিবের সঙ্গে তিনি ত্রিমূর্তিতে বিরাজমান। তিনি অবশ্য হিন্দু বেদান্ত দর্শনের সর্বোচ্চ দিব্যসত্ত্বা ব্রহ্মের সমান রূপ নন। বরং বৈদিক দেবতা প্রজাপতিকে ব্রহ্মার সমরূপ বলা চলে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে, মূল বিশেষ্য প্রাতিপদিক ব্রহ্মন্ শব্দটি থেকে দুটি পৃথক বিশেষ্য সৃষ্টি হয়েছে। এর বিপরীতে রয়েছে পুং বিশেষ্য ব্রহ্মন্। এই শব্দের কর্তৃপদমূলক একবচন রূপটিই হল ব্রহ্মা। এই শব্দটি ব্যক্তিনাম ও হিন্দু সৃষ্টিদেবতার নাম হিসেবে ব্যবহৃত। এঁকে নিয়েই আমাদের বর্তমান নিবন্ধ।

যম— হিন্দুধর্মে, যম হল মৃত্যুর দেবতা। ঋগ্বেদে তাঁর সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মানবজাতিকে বাস করার জন্য একটি জায়গা খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছেন, এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাঁদের পছন্দ মত পথ বেছে নেওয়ার বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছেন। বৈদিক মতবাদ অনুযায়ী ধারনা করা হয় যে, যম হচ্ছেন প্রথম নশ্বর ব্যক্তি যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং স্বর্গীয় আবাসে গমন করেছিলেন। 

অগ্নি— আগুনের দেবতা। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদিক দেবতা। অগ্নি আগুনের দেবতা এবং যজ্ঞের দেবতা। অগ্নিকে দেবতাদের বার্তাবহ বলে মনে করা হয়। তাই হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, যজ্ঞকালে অগ্নির উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করলে সেই আহুতি দেবতাদের কাছে পৌঁছে যায়। অগ্নি চিরতরুণ এবং তিনি অমর। বেদে অগ্নি পৃথিবীর দেবতা। তিনি বায়ুর দেবতা ও আকাশের দেবতা ইন্দ্রের সঙ্গে ঋগ্বেদে অন্যতম প্রধান দেবতা হিসেবে পরিগণিত হন। অগ্নি স্বর্গ ও মর্ত্যের যোগাযোগ রক্ষাকারী দেবতা। বৈদিক যজ্ঞের সঙ্গে অগ্নির নাম সংযুক্ত। তিনি যজ্ঞের আহুতি লোকান্তরে নিয়ে যান। তার বাহন মেষ।

ধন্বন্তরি— চিকিৎসার অধিষ্ঠাতা দেবতা ধন্বন্তরি। ইনি রোগ বা আরোগ্য দূর করার জন্য পূজিত হতেন। নামের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও, এই দেবতা এখন আর পূজিত হন না।

ধরিত্রী— পৃথিবীর দেবীকল্প। শস্যদেবী, ধরিত্রী দেবী এবং ধরিত্রীর উর্বরতার জন্য পূজনীয় ছিলেন। ধরিত্রীর অর্থ হল পৃথিবী। পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য সর্বসমেত ধার্য  হল ধরিত্রী। এই দেবীও প্রাচীণ বৈদিক যুগে পূজিত হলেও, বর্তমানে পূজিত হন না ইনিও।