শেষ বিধানসভা ভোটে বিজেপি পেয়েছিল তিনটি আসন। আর তিন বছরের মাথায় এবারের লোকসভা নির্বাচনে সেই দলই বাংলা থেকে ১২৯টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে গেল গেরুয়া শিবির। 

লোকসভা নির্বাচনের ফল বলছে বাংলা থেকে ১৮টি আসন পেয়েছে বিজেপি। বিধানসভা কেন্দ্র অনুযায়ী এই ফলের বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে ১২৯টিতেই পদ্ম প্রতীকে আস্থা রেখেছেন মানুষ। আর এবারের ফল অনুযায়ী তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে ১৫৮টি কেন্দ্রে। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটের আগে যা মমতা এবং তৃণমূলের কাছে চরম অশনি সঙ্কেত। 

শুধু আসন সংখ্যার দিক থেকে নয়, ভোট প্রাপ্তির নিরিখেও তৃণমূলকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে বিজেপি। ২০১৪ সালে বাংলা থেকে ১৭ শতাংশ মতো ভোট পেয়েছিল বিজেপি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তা ১০ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। সেখান থেকে এবারের নির্বাচনে একলাফে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের ভোট প্রাপ্তির হার ৪০ শতাংশের উপরে নিয়ে গিয়েছে বিজেপি। সেখানে তৃণমূল পেয়েছে ৪৩ শতাংশ ভোট। ২০১৬ সালে যা ছিল ৪৫ শতাংশের কাছাকাছি। 

মমতার সবথেকে উদ্বেগের কারণ অবশ্য উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহল। উত্তরবঙ্গে এবারে একটিও আসন জেতেনি তৃণমূল। সেখানে ৪৩টি বিধানসভা আসনে এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। একই প্রবণতা জঙ্গলমহলেও। উত্তরের আলিপুরদুয়ারের মতো জঙ্গলমহলের আদিবাসী অধ্যুষিত পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামে একপেশে ফল করেছে বিজেপি। ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যাচ্ছে, গ্রামীণ বাংলার ২৭টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টিতেই এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। শুধু তাই নয়, উপনির্বাচনের সৌজন্যে এখনই বিধানসভায় নিজেদের বিধায়ক সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলেছে বিজেপি। আটটি বিধানসভার উপনির্বাচনে চারটিতেই জয়ী হয়েছে তারা। এমন কী, কৃষ্ণগঞ্জের মতো কেন্দ্রে তৃণমূল বিধায়কের মৃত্যুতে ভোট হলেও সেখানে জিতে গিয়েছে বিজেপি।

প্রত্যাশিতভাবেই সংখ্যালঘু ভোটার অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলিতে ভাল ফল করেছে রাজ্যের শাসক দল। ডায়মন্ড হারবার, মথুরাপুর, জয়নগর, জঙ্গিপুর, মুর্শিদাবাদ, উলুবেড়িয়া, বসিরহাটের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত লোকসভাগুলিতে দাগ কাটতে পারেনি বিজেপি। আবার মালদহ উত্তর এবং মালদহ দক্ষিণের মতো কেন্দ্রগুলিতে ভাল সংখ্যালঘু ভোট থাকলেও তা দখলে ব্যর্থ তৃণমূল। 

ফলে সংগঠনকে চাঙ্গা করে হারানো জমি পুনরুদ্ধার মমতার কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। গত বিধানসভা ভোটের নিরিখে রাজ্যে দুশোর বেশি আসনে জিতেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। লোকসভা ভোট অবশ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, তার থেকে প্রায় পঞ্চাশটি আসন তৃণমূলের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। ভোটের ফলে বিজেপি-ও বুঝে গেল, রাজ্যের কোন অংশগুলিতে তাদের আরও বেশি করে থাবা বসানো প্রয়োজন। স্বভাবতই এই ভোটের ফলে বিজেপি-র সংগঠন আরও মজবুত হবে। যে এলাকাগুলিতে এতদিন শাসক দল একচেটিয়া দাপট দেখিয়েছে, সেখানেও এবার থেকে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে গেরুয়া বাহিনী। এই অবস্থায় যারা মমতার সহায় হতে পারত, সেই বাম এবং কংগ্রেসের রক্তক্ষরণ অব্যাহত। দু' বছরের মধ্যে রাতারাতি তাঁরা বিজেপি-র প্রতিরোধের মতো জায়গায় চলে যাবে, তা কষ্ট কল্পনা। ফলে বিপদ এবং সমস্যা কোথায় তা বুঝতে পারলেও তার সমাধান করাটা একেবারেই সহজ হবে না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।