রাজ্যের সব কেন্দ্রেই যেন লড়াইটা শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি-র। সবজায়গায় যেন থেকেও নেই বামেরা। কিন্তু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এই নজরকাড়া কেন্দ্রেই যেন হাওয়াটা অন্যরকম। বিজেপি-র মনোবল ভাঙার জন্য নয়, সিরিয়াস আলোচনাতেও শাসক দলের নেতা-কর্মীরা স্বীকার করছেন, ডায়মন্ড হারবারে তাঁদের মূল প্রতিপক্ষ সিপিএম-ই। কিন্তু ডায়মন্ড হারবারে শাসক দলের প্রার্থীর নামটাই যেন দলের নেতা কর্মীদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়- রাজ্য রাজনীতির তারকা বললে যাঁকে অত্যুক্তি হয় না। অভিষেককে কতটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবেন ফুয়াদ, রবিবার তার উত্তর পেতেই হয়তো গোটা রাজ্যের নজর থাকবে ডায়মন্ড হারবারের দিকে।

ভোটের চব্বিশ ঘণ্টা আগে বিরোধী প্রার্থীর এই তারকা সত্ত্বাকে পাত্তা দিতে নারাজ ডায়মন্ড হারবারের সিপিএম প্রার্থী ফুয়াদ হালিম। ভিআইপি প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় ফুয়াদ নিজেই রবিবার ভিআইপি-দের উপরে ভরসা রাখছেন। তারকা প্রতিপক্ষকে বাড়তি গুরুত্ব না দিয়ে ফুয়াদের জবাব, "নির্বাচনে আসল ভিআইপি হলেন ভোটাররা. নির্বাচন কমিশনের কাছে সব প্রার্থীই সমান।"

গত দু' মাস ধরে টানা ডায়মন্ড হারবারে প্রচার করেছেন পেশায় চিকিতসক ফুয়াদ হালিম। রবিবার তাঁর আসল পরীক্ষা. ফুয়াদ নিজে বলছেন, "পঞ্চায়েত ভোটে ডায়মন্ড হারবারে একশো শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছে তৃণমূল। সেই রাগ রয়েছে মানুষের মনে। মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।" মানুষের ভোট দিতে চাওয়ার এই তাগিদটাই যেন ভরসা দিচ্ছে তাঁকে। তাঁর সঙ্গে ভরসা দিচ্ছে প্রচারপর্বে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া। কিন্তু সেই ভালবাসা আর রাগের প্রতিফলন ভোটবাক্সে হবে তো? পঞ্চায়েত নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি যাতে রবিবার না হয়, তা নিশ্চিত করার মতো সংগঠন কি তাঁর দলের আছে?

এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে নারাজ সিপিএম প্রার্থী।. তাঁর দাবি মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কয়েকদিন আগেই ডায়মন্ড হারবারের এসডিপিও-কে সরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যাঁকে নিয়ে অভিযোগ ছিল বামেদের। সরানো হয়েছে রাজ্যে স্বরাষ্ট্র সচিবকেও। এই বিষয়গুলি রবিবারের ভোটের আগে বাড়তি ভরসা দিচ্ছে বামেদের। একই সঙ্গে ডায়মন্ড হারবারের সিপিএম প্রার্থীর অভিযোগ, "গত দশ বছর ধরে হাতে থাকলেও ডায়মন্ড হারবারকে অবহেলা করেছে তৃণমূল, শাসক দলের অত্যাচারে অতীষ্ট ডায়মন্ড হারবারের মানুষ।" 

স্বভাবতই সিপিএম প্রার্থীর অভিযোগ মানতে নারাজ তৃণমূল নেতারা। অভিষেক নিজে এই কেন্দ্রে খুব একটা সময় দেননি প্রচারে, এতটাই আত্মবিশ্বাসী তিনি। ফুয়াদ অবশ্য তাতেও বিচলিত নন, বলছেন "বিরোধী প্রার্থী কী করবেন তা ভাবা আমার কাজ না।" অভিষেক গুরুত্ব না দিলেও তৃণমূল নেতারা কিন্তু স্বীকার করছেন, সিপিএম-ই তাঁদের আসল প্রতিপক্ষ। বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলের দাবি, অভিষেকের জয়ের বিষয়ে তাঁরা দুশো শতাংশ নিশ্চিত. তাঁর দাবি, গত পাঁচ বছরে অভিষেক এই কেন্দ্রের যা উন্নয়ন করেছেন, তাতেই মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেবে। 

তবে পাঁচ বছর আগের লোকসভা ভোটের হিসেব একদিকে যেমন তৃণমূলের অস্বস্তি সামান্য বাড়াবে, তেমনই তা স্বস্তি দিচ্ছে সিপিএম প্রার্থী ফুয়াদকে। ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবারে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রেই তৃণমূলের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই দিয়েছিলেন সিপিএম প্রার্থী। পাঁচ বছর আগে ৭১২৯৪ ভোটে জেতেন অভিষেক। তার উপর এবারে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রের একাধিক বিধানসভায় অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা ঘুরছে শাসক দলের সমর্থকদের মধ্যে।

সিপিএম প্রার্থী ফুয়াদ হালিমের আবার অভিযোগ, এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী ইতিমধ্যেই শাসক দলের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। সংখ্যালঘুদের ভোট শাসক দল কতটা ধরে রাখতে পারে, বিজেপি কতটা হিন্দু ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারে, ডায়মন্ড হারবারে এবারে তা বড় ফ্যাক্টর অবশ্যই।

গরিবের ডাক্তারবাবু বলে নিজের দল এবং রোগীদের মধ্যে সুখ্যাতি রয়েছে প্রয়াত সিপিএম নেতা হাসিম আব্দুল হালিমের পুত্র ফুয়াদের। রোগ যত বড় হোক না কেন, রোগীর টেনশন কমিয়ে দেওয়াটাই তাঁর পেশার অঙ্গ। সেই অভ্যাস থেকেই হয়তো প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আগের দিন কোনও টেনশন নেই তাঁর গলায়। আর পাঁচজন প্রার্থীর মতো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। শাসক, বিরোধী সব দল যখন নির্বাচন কমিশনের মুণ্ডপাত করছে, তখন ঠান্ডা গলায় ডাক্তারবাবু বলছেন, "সু্প্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে যেমন রাগ করে লাভ নেই, তেমনই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাগ দেখানোর মানে হয় না। তাঁদের উপরেই ভরসা রাখতে হবে।"