পুলিশি হেফাজতে এক ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলের মৃত্যুকে নিয়ে এখন উত্তাল হয়ে রয়েছে দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ু। লকডাউনের সময়  নির্ধারিত সময়ের থেকে বেশিক্ষণ দোকান খুলে রাখার অভিযোগ ছিল পি জয়রাজ ও তাঁর ছেলে জে বেনকিসের বিরুদ্ধে। সেই কারণে বাবা ও ছেলেকে রাতের বেলা থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এর ঘটনার পরদিন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় জয়রাজ ও তাঁর ছেলেকে। হাসপাতালে ভর্তির সময় জয়রাজের বুকে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। বেনকিসের প্রবল জ্বর। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও দু'জনের একজনকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। 

এই ঘটনায় জয়রাজ ও বেনকিসের পরিজনদের অভিযোগ, লক আপের মধ্যে প্রবল অত্যাচার করেই মেরে ফেলা হয়েছে তাঁদের। পরিবারের দাবি বাবা ও ছেলের উপর অকথ্য নির্যাতন করেছিল পুলিশ।  মৃতের পরিজনেদের অভিযোগ, সান্তনকুলম থানায় পুলিশ জয়রাজ ও তাঁর ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর করে। তাতেই মৃত্যু হয় তাঁদের। ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলের শরীরে পরিজনেরা আঘাতের চিহ্নও দেখেছেন বলে অভিযোগ করেন।এই ঘটনাকে ঘিরেই এখন পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণের মধ্যে।

আরও পড়ুন: পঙ্গপালের দখলে গুরুগ্রামের সাইবার সিটি থেকে ফরিদাবাদ, এবার হামলার নিশানায় দেশের রাজধানী

পুলিশের অত্যাচারে পি জয়রাজ এবং তাঁর ছেলে জে বেনিকস-এর রেকটাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে দাবি করেছেন তাঁদের এক আত্মীয়। এই ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনার দাবি করেছেন তাঁরা।

তামিলনাড়ুর তুতিকোরিনের বাসিন্দা জয়রাজ ও তাঁর ছেলে বেনকিস। সান্তনকুলামে একটি মোবাইলের দোকান রয়েছে তাঁদের। নির্দিষ্ট সময়ের পরেও দোকান খোলা রাখার অভিযোগে গত ১৯ জুন বাবা ও ছেলেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত সোমবার সকালে তাঁদের মৃত্যুর খবর সামনে আসে। আর তারপর থেকেই ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছে তামিলনাড়ু। পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গত শুক্রবার তুতিকোরিনের সমস্ত দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভও দেখান হয়। 

তামিলনাড়ুর গণ্ডি অতিক্রম করে ক্ষোভের আগুন এবার ছড়াতে শুরু করেছে দেশজুড়ে। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে চলছে প্রতিবাদ। বাবা ও ছেলের উপর পুলিশের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। এমনকি জয়রাজ ও বেনকিসের মৃত্যুকে অনেক আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গও তুলনা শুরু করেছেন নেটিজেনরা। টুইটারে হ্যাশট্যাগ দিয়ে জয়রাজ ও বেনিক্সেক মৃত্যুর বিচার চাই বলে পোস্ট করছেন বহু নেটিজেন। 

 

বাবা ও ছেলের এই মৃত্যুকে ঘিরে ক্রমে উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতিও। এই ঘটনায় শাসক দল ও পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে বিরোধী ডিএমকে শিবির। ইতিমধ্যে এই ঘটনায়  দুই সাব ইনসপেক্টর-সহ চার পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পালানিস্বামী  জয়রাজ ও বেনকিসের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে তাঁদের পরিবারকে ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। মৃতদের পরিবারের যে কোনও একজনকে চাকরি দেবেন বলেও জানান। তবে পুলিশের অত্যাচারেই ব্যবসায়ী ও তাঁর ছেলে প্রাণ হারিয়েছেন কিনা সেই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীও।

আরও পড়ুন: বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে ব্রহ্মপুত্র, করোনা আবহে অসমে বন্যা দুর্গত আড়াই লক্ষ মানুষ

এদিকে মুখ্যমন্ত্রী পালানিস্বামী যতই চুপ থাকুন না কেন  প্রতিবাদে ততই সোচ্চার হয়েছেন তামিলনাড়ুর বিরোধী দলনেতা এম কে স্ট্যালিন। তিনি দাবি করেছেন যে, যারা এই বর্বরতার জন্য যারা দায়ী, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। ডিএমকে সাংসদ কানিমোঝিও অভিযোগ জানিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও মৃতদের জন্য শোকপ্রকাশ করে ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন।

এই মামলায় ইতিমধ্যে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চের বিচারকেরা তদন্তকারী আধিকারিককে সান্তনকুলাম ক্যাম্প অফিস থেকেই তাঁর তদন্ত চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে সেখানে গিয়ে তদন্ত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত বিচারকদের। সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া সান্তনকুলামে রাখা কেস ডায়েরিটিও বাজেয়াপ্ত করে নিতে হবে। বিচারকদের মতে, কেস ডায়েরি এবং অন্যান্য মূল নথিগুলি নিরাপদ হেফাজতের জন্য প্রধান তদন্তকারীর কাছে জমা দেওয়া দরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এর পাশাপাশি মৃতদের বাড়ি গিয়ে মহিলা সদস্যদের কাছ থেকে তাঁদের বয়ান নিয়ে নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন বিচারকেরা।

সান্তনকুলাম পুলিশ এর আগেও এই মাসের গোড়ার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গিয়ে এক ব্যক্তিকে খুন করে বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও এক কোভিড কারফিউ ভঙ্গকারীকে মেরে তাঁর কিডনি বিকল করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ এখানকার পুলিশের বিরুদ্ধে। ক্রিকেটার শিখর ধাওয়ান পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হন। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়াও। ট্যুইট করে এই ঘটনায় দোষীদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি তুলেছেন তিনি।