গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এর তথ্য অনুসারে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের লেখক। কাটতির হিসেবে বাইবেল ও উইলিয়াম শেক্সপিয়ারই তাঁর সমকক্ষ। এ পর্যন্ত তাঁর বিক্রি হওয়া বইয়ের সংখ্যা চারশো কোটিরও বেশী। শুধু তাই নয়, গোটা দুনিয়ায় ১০৩টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে তাঁর বইগুলি। তিনি রহস্য উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক। সাহিত্যে বিস্ময়কর রহস্য সৃষ্টি ও অসামান্য গোয়েন্দাগিরির জন্য তাঁকে ‘দ্যা কুইন অফ ক্রাইম’  বলা হয়। 
ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি আগাথা ক্রিস্টির। তিনি তাঁর মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি তিনি পাশ্চাত্য সংগীতেরও তালিম নেন। তবে তিনি এতই নার্ভাস হয়ে যেতেন যে পার্ফম করতে পারতেন না। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সে তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটলে পরিবারকে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।  
প্রথম বইটি তিনি তাঁর বোনের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করেই লিখেছিলেন। তবে প্রথম বইটি ছাপার অক্ষরে দেখতে তাঁকে পাঁচ বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ছ’জনের বেশি প্রকাশক তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবু থেমে থাকেননি তিনি। লেখা চালিয়ে গেছেন। ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা করেছেন সাফল্যে পৌঁছানোর জন্য। তারপর পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। যে উচ্চতা বিশ্বসাহিত্যের আর কোনও লেখক এখনও ছুঁতে পারে নি। 


একেবারে প্রথমদিকে ‘ম্যারি ওয়েস্টকোট’ এই  ছদ্দনাম ব্যবহার করে তিনি লেখা শুরু করেছিলেন। ওই নামেই তাঁর ৬ টি রোমান্টিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি আগাথা ক্রিষ্টি নামেই লিখতে আরম্ভ করেন। ৬৬টি রহস্য উপন্যাস ও ১৪টি ছোটগল্পের জন্য তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সমগ্র বিশবে। গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো ও মিস মার্পল-এর রহস্যভেদ  কাহিনীগুলির সঙ্গে যথেষত পরিচিত নন এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া যাবে না।  
বিখ্যাত বেলজিয়ান গোয়েন্দা এরকুল পোয়ারো একই রহস্যের জট খুলেছেন ৩৩টি উপন্যাসে এবং ৫০ টিরও বেশী গল্পে। অন্যদিকে মিস মার্পল ১২টি উপন্যাস এবং ২৭টির বেশি গল্পে রহস্য উন্মোচন করেছেন।
লেখকের গোয়েন্দা রহস্য উদ্ঘাটন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো গোয়েন্দা কাহিনীর লেখকের পক্ষে কি মারা যাওয়ার পরেও রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব? অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আগাথা ক্রিষ্টির ক্ষেত্রে সেই অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল।  তিনি বেঁচে না থাকলেও রহস্য উদ্ঘাটনে তাকে ৫০ শতাংশ ক্রেডিট দেওয়াই যায়।   
একটি হাসপাতালে একটা বাচ্চা কোনো এক অজানা রোগে প্রয় মারা যেতে বসেছিল। অথচ ডাক্তাররাও বুঝতে পারছিলেন না বাচ্চাটির অসুখটা কি। ঘটনাচক্রে হাসপাতালে শিশুটির দেখভাল করছিলেন যে নার্স তিনি ছিলেন আগাথা ক্রিষ্টির ভক্ত।
হাসপাতালের চিকিতসকরা তো শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন। আর পাশেই ছিলেন ওই নার্স। একটা সময়ে সেই নার্সের আগাথা ক্রিস্টির উপন্যাস ‘দ্য পেইল হর্স’ এর কথা মনে পড়ে যায়। উপন্যাসটির একটি চরিত্র থ্যালিক পয়জিং-এ আক্রান্ত হয়েছিল। সেই নার্স অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন উপন্যাসের চরিত্রের রোগের লক্ষণের সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে হাসপাতালের ওই মুমূর্ষু শিশুটির।  

 
চিকিৎসকরা যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন শেষ মুহূর্তের চেষ্টা হিসেবে নার্স বাচ্চাটির থ্যালিয়াম লেভেল পরীক্ষা করতে অনুরোধ করেন। পরীক্ষা করে দেখা গেলো শিশুটির শরীরে থ্যালিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় দশগুণ বেশি। এরপর শুরু হয় নতুন করে চিকিৎসা। শেষে দেখা গেল শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে। এরপরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল শিশুটির যে বাড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানে নিয়মিত কীটনাশক রাখা হয়। সেই কীটনাশকের মধ্যেই ছিল থ্যালিয়াম। 
পৃথিবীর বিখ্যাত লেখক আগাথা ক্রিস্টির লেখা রহস্যের মতো তার ব্যক্তি জীবনেও রহস্যের ঘাটতি ছিল না। তখন তিনি বেশ পরিচিত লেখক। ডিসেম্বরের কোনও একটি দিন তিনি হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান। দু-এক দিন তার কোনও খোজ খবর পাওয়া যায় না। প্রায় চারটি দেশের সংস্থা তন্ন তন্ন করেও তাঁর খোঁজ করেও তাঁকে উদ্ধার করতে পারে না। অবশেষে প্রায় ১১ দিন পর তাঁকে পাওয়া যায় ইয়র্কশায়ারের এক হোটেলে।
ধারণা করা হয় সাময়িক অ্যামনেসিয়ার কারণে এমনটা ঘটেছিলো। এরপর এই ঘটনা নিয়ে অনেক কল্পকাহিনী ছড়িয়ে পরে চারিদিকে। কেউ কেউ বলেন এ্যালিয়েন নিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। আবার কেউ কেউ বলেন এটা পাবলিসিটি স্টান্ট। কারন সে সময় ক্রিস্টির বইয়ের বিক্রি কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবে এই ঘটনা সম্পর্কে আগাথা ক্রিস্টি নিজে কিছুই বলেন নি। তাই সেই ঘটনা রহস্যই থেকে গেছে।