
Apple iPhone 18 Pro: আপনি কি 'নো-কস্ট ইএমআই' (no-cost EMI)-এর মাধ্যমে অ্যাপল আইফোন ১৮ প্রো (Apple iPhone 18 Pro) কেনার কথা ভাবছেন? একবারে পুরো দাম পরিশোধ করার চেয়ে মাসিক কিস্তির অঙ্কটি হয়তো কম বা সহজ মনে হতে পারে। তবে, এই আকর্ষণীয় অফারের আড়ালে অতিরিক্ত খরচ এবং ঋণ নেওয়ার ঝুঁকি লুকিয়ে থাকতে পারে।
ইউনিকর্ন স্টোর (Unicorn Store) ২৫৬ জিবি (256GB) মডেলের জন্য ২৬,৩১৬ টাকা থেকে শুরু হওয়া ৬ মাসের 'নো-কস্ট ইএমআই' সুবিধা দিচ্ছে। ফোনটির বিক্রয়মূল্য ১,৬৪,৯০০ টাকা হলেও, ৭,০০০ টাকা ছাড়ের পর এর দাম দাঁড়িয়েছে ১,৫৭,৯০০ টাকায়।
এই ছাড়টি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাঙ্কের কার্ডের মাধ্যমে ইএমআই-তে কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই সুবিধা পাওয়ার পরেও, ক্রেতাকে টানা ছয় মাস ধরে বেশ বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
৫১২ জিবি (512GB) মডেলের ক্ষেত্রে মাসিক কিস্তির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩০,৪৮২ টাকায় এবং ১ টিবি (1TB)-এর ক্ষেত্রে তা হয় ৩৮,৮১৫ টাকা। ২ টিবি (2TB) মডেলের কার্যকর মূল্য ৩,০৭,৯০০ টাকা হলে এর মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ৫১,৩১৫ টাকায়। এভাবে দামকে কিস্তিতে ভাগ করার ফলে কেনার মোট খরচ বা মূল দামের কোনো পরিবর্তন হয় না, কেবল অর্থ পরিশোধের সময়সূচি বা পদ্ধতিটি পরিবর্তিত হয়।
প্রথম সম্ভাব্য সমস্যা বা ফাঁদটি হলো—একবারে পুরো দাম পরিশোধ করলে হয়তো আরও ভালো কোনো অফার পাওয়া যেত, যা ইএমআই বেছে নিলে হাতছাড়া হয়ে যায়। ধরা যাক, ৬০,০০০ টাকার একটি ফোন এককালীন মূল্য পরিশোধের অফারে ৫৩,০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এর পরিবর্তে যদি ১০,০০০ টাকার ৬টি কিস্তি বেছে নেওয়া হয়, তবে ক্রেতাকে মোট ৬০,০০০ টাকাই পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, কোনো অতিরিক্ত চার্জের কথা বিবেচনা করার আগেই ক্রেতা ৭,০০০ টাকা বেশি খরচ করে ফেলছেন।
তবে, এককালীন মূল্য পরিশোধের ছাড় না পাওয়াটা সব ইএমআই অফারের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। ইউনিকর্নের ঘোষিত দামের মধ্যেই ৭,০০০ টাকার ইএমআই ছাড়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাই আসল তুলনাটি হওয়া উচিত ইএমআই-তে পরিশোধযোগ্য মোট অর্থের সাথে এককালীন মূল্য পরিশোধের অফারের। কেবল 'আকর্ষণীয় ফাইন্যান্সিং অফার' বা 'নো-কস্ট ইএমআই'-এর মতো তকমা দিয়ে এই তুলনার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় উদ্বেগের বিষয়টি হলো ঘোষিত কিস্তির বাইরেও বিভিন্ন চার্জ বা ফি। কেনাকাটার মূল্যকে ইএমআই-তে রূপান্তর করার জন্য ব্যাংক প্রসেসিং ফি বা প্রক্রিয়াকরণ ফি ধার্য করতে পারে। এই ফি-এর পরিমাণ ১৯৯ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া, সুদের অংশের ওপর ১৮% জিএসটি (GST) ধার্য করা হলে খরচের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এই অতিরিক্ত খরচগুলো সাধারণত বড় করে দেখানো মাসিক কিস্তির অঙ্কের বাইরে আলাদাভাবে ধরা হয়। এগুলোর সঠিক পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্সিং বা অর্থায়নের শর্তাবলির ওপর। তাই, এই ব্যবস্থায় কোনো খরচ নেই—এমনটা ধরে নেওয়ার আগে ক্রেতাদের উচিত পরিশোধের সম্পূর্ণ বিবরণ যাচাই করে নেওয়া।
আরেকটি ফাঁদ হলো কম কিস্তির অঙ্ক দেখে ফোনটিকে সস্তা মনে করা। 'ইন্ডিয়া স্টোর'-এর বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক্সচেঞ্জ বা পুরনো ফোন বিনিময়ের সুবিধাসহ ১২ মাসের কিস্তি ৯,৫৭৫ টাকা এবং এক্সচেঞ্জ ছাড়া ১৩,৭৪২ টাকা।
কম টাকার অঙ্কটি তখনই প্রযোজ্য হয় যখন ভালো অবস্থায় থাকা একটি যোগ্য 'অ্যাপল আইফোন ১৫ প্রো' (১২৮ জিবি) জমা দেওয়া হয়। এই হিসাবের মধ্যে ৪০,০০০ টাকার 'ট্রেড-ইন ভ্যালু' (পুরনো ফোনের বিনিময় মূল্য) এবং ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত 'এক্সচেঞ্জ বোনাস' অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তবুও, কম কিস্তির ক্ষেত্রে হয় শুরুতে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দিতে হয়, নতুবা দীর্ঘ সময় ধরে কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। ৩৩% ডাউন পেমেন্ট বা অগ্রিম জমা দিলে, ১৬ মাসের কিস্তি দাঁড়ায় এক্সচেঞ্জসহ ৪,৮১১.৪০ টাকা এবং এক্সচেঞ্জ ছাড়া ৬,৯০৫ টাকা। সুতরাং, শুধুমাত্র মাসিক কিস্তির অঙ্ক দেখলে বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যগুলো আড়ালে থেকে যায়।
আপাতদৃষ্টিতে সহজসাধ্য মনে হওয়া একাধিক কেনাকাটাও পরিবারের বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ধরুন, একটি টেলিভিশনের জন্য ৪,০০০ টাকা, ট্যাবলেটের জন্য ৩,৫০০ টাকা এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির জন্য ৫,০০০ টাকা কিস্তি দিতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাড়ি ভাড়া, বাজার-সদাই বা অপ্রত্যাশিত খরচের আগেই এই কিস্তিগুলোর পেছনে মাসে ১২,৫০০ টাকা চলে যায়। এর সাথে ফোনের কিস্তি যোগ হলে এই নির্দিষ্ট খরচের বোঝা আরও বেড়ে যায়।
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের সুযোগও কমে যেতে পারে। সম্পূর্ণ অর্থায়নে কেনাকাটা করলে কার্ডের সীমার (লিমিট) একটি অংশ আটকে যেতে পারে। যেমন, ১.৫ লাখ টাকার লিমিট থাকলে ৯০,০০০ টাকার কেনাকাটা করার পর মাত্র ৬০,০০০ টাকা ব্যবহারের জন্য অবশিষ্ট থাকে। এর ফলে জরুরি প্রয়োজনে খরচ করার সুযোগ কমে যেতে পারে।
ক্রেডিট কার্ডের পুরো বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়। ঋণদাতার শর্ত অনুযায়ী, বকেয়া অর্থের ওপর সাধারণ ক্রেডিট কার্ডের উচ্চ হারে সুদ ধার্য হতে পারে। তখন একটি সহজসাধ্য কেনাকাটাও পরিশোধের ক্ষেত্রে কঠিন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
'নো-কস্ট ইএমআই' মানেই যে ঋণের ফাঁদ, তা কিন্তু নয়। তবে ছাড়, বিভিন্ন ফি, আটকে থাকা ক্রেডিট লিমিট এবং একাধিক কিস্তির বোঝা ঋণ ব্যবস্থাপনা কঠিন করে তুলতে পারে। তাই শুধু মাসিক কিস্তির অঙ্কের দিকে না তাকিয়ে মোট খরচের হিসাব তুলনা করা উচিত।