
Gold Import India: আগস্ট মাসে সোনার আমদানি প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে, কিন্তু গত পাঁচ মাসের তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। ক্রেতারা বাজার থেকে উধাও হয়ে যাননি; বরং, তাঁরা দামী সোনার পরিবর্তে হালকা ওজনের গয়না দিয়ে নিজেদের বাজেট সামলাচ্ছেন। আগস্ট মাসে ভারতে সোনার আমদানি ব্যাপক হারে ৫৭.৭৫ শতাংশ কমে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এই তথ্য একটি প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয়রা কি সোনা কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন?
মনে হচ্ছে, সোনার উচ্চমূল্য ক্রেতাদের কেনাকাটার ধরণ বদলে দিচ্ছে। যেখানে আগে ভারী গয়না কেনা হতো, এখন মানুষ একই বাজেটের মধ্যে হালকা গয়না কেনার চেষ্টা করছে। যদি সোনার আমদানি কমেই থাকে, তাহলে কেনাকাটা কম হয়েছে বলে কেন ধরা হবে না?
বিদেশ থেকে ভারতে আসা সোনা এবং দোকান থেকে গ্রাহকদের সোনা কেনা দুটি ভিন্ন বিষয়। আমদানি কমার অর্থ এই নয় যে দোকান থেকে সোনা কেনার পরিমাণও একই অনুপাতে কমে গেছে। বাজারে ইতিমধ্যেই সোনার একটি মজুত রয়েছে। তাছাড়া, গ্রাহকরা পুরোনো গয়নার বদলে নতুন গয়না নিচ্ছেন। সুতরাং, প্রচুর পরিমাণে নতুন সোনা না কিনেও কেনাকাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তবে, এর মানে এই নয় যে সোনার উচ্চমূল্য চাহিদাকে প্রভাবিত করেনি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের অনুমান অনুযায়ী, উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারতে গয়না, মুদ্রা এবং বিস্কুটের জন্য সোনার মোট চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ টন বা প্রায় ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
সোনার উচ্চমূল্যের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে ভোক্তাদের কেনাকাটার উপর। বিয়ের জন্য গয়নার তালিকা একই থাকতে পারে, কিন্তু ওজন কমে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো পরিবার আগে ১০ গ্রাম ওজনের গয়নার জন্য বাজেট করত, তবে তারা এখন ৬-৭ গ্রাম ওজনের হালকা ডিজাইনের গয়না বেছে নিতে পারে। এর মানে হলো, গয়না কেনা বন্ধ হয়নি, কিন্তু ওজন কমে গেছে।
এ কারণেই বাজারে হালকা ওজনের গয়নার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভোক্তারা ডিজাইন এবং প্রয়োজনের সাথে আপোস না করে ওজন কমিয়ে মোট খরচ তাদের বাজেটের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছেন।
দামি সোনা কমানোর আরেকটি উপায় হলো পুরনো গয়না বিনিময় করা। বাড়িতে রাখা পুরোনো সোনা নতুন গহনার সাথে বিনিময় করলে, গ্রাহককে সম্পূর্ণ নতুন সোনা কিনতে হয় না। এতে গ্রাহকের নগদ খরচ কমে যেতে পারে। তবে, বিনিময়ের সময় পুরোনো সোনার বিশুদ্ধতা, এর মূল্যায়ন, কর্তন এবং নতুন গহনা তৈরির খরচ সাবধানে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে সোনার বাজারের একটি আকর্ষণীয় গাণিতিক বিশ্লেষণ উঠে আসে। ক্রিসিলের মতে, সংগঠিত গহনা ব্যবসায়ীদের ওজনভিত্তিক বিক্রি ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ কমে ৬২০ থেকে ৬৪০ টনে নেমে আসতে পারে, কিন্তু দাম বাড়ার কারণে বড় গহনা ব্যবসায়ীদের আয় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে এটি ব্যাখ্যা করা যাক: আগে একজন গ্রাহক ১০ গ্রাম সোনা কিনতেন, কিন্তু এখন দাম বাড়ার কারণে তিনি ৭ গ্রাম কিনছেন। ওজন কমেছে, কিন্তু সোনার দাম বাড়ার কারণে ৭ গ্রামের একটি নোটও উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হতে পারে। এর মানে হলো, দাঁড়িপাল্লার সোনার পরিমাণ কমছে, কিন্তু বিলের পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমছে না।
বড় গহনা ব্র্যান্ড এবং ছোট স্থানীয় গহনা ব্যবসায়ীদের উপর এর প্রভাব একই রকম নয়। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বেশি স্টক এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড থাকে। তবে, দামী সোনা কেনার পর ছোট দোকানদারদের পক্ষে স্টক বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
যদি গ্রাহকরা নতুন সোনা কেনার পরিবর্তে পুরোনো সোনার বদলে নতুন গহনা কেনেন, তাহলে নতুন সোনার বিক্রি কমে যেতে পারে। ফলস্বরূপ, ছোট গহনা ব্যবসায়ীদের আয় মূলত গহনা তৈরির খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
আগস্টে আমদানি প্রায় ৫৮% কমে গেলেও, ২০২৬-২৭ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ভারত ১৭.৪৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা আমদানি করেছে। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৩৮% বেশি।
এর মানে হলো, আগস্ট মাসের এই উল্লেখযোগ্য পতনকে পুরো বছরের চাহিদার অনুরূপ পতন হিসেবে ব্যাখ্যা করাটা অকালপক্ক হবে। আগামী কয়েক মাসের তথ্য থেকে জানা যাবে এটি এক মাসের সাময়িক ধাক্কা, নাকি ক্রয়ের ধরনে কোনো বড় পরিবর্তন।
মে মাস থেকে সোনার আমদানি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। সরকার সোনা ও রুপার ওপর আমদানি শুল্ক ৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করেছে, যা ১৩ই মে, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করে অপ্রয়োজনীয় চাহিদা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস করা।
ভারত বিদেশ থেকে সোনা কেনার জন্য ডলার খরচ করে। তাই, সোনার আমদানি কমলে ডলারের বহিঃপ্রবাহের ওপর চাপ কমতে পারে, কিন্তু উচ্চ শুল্ক আরেকটি ঝুঁকিও তৈরি করে।
অতীতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল জানিয়েছে যে, ভারতে সোনার ওপর আমদানি শুল্ক বাড়লে চোরাচালানের মাধ্যমে সোনা প্রবেশের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই, সরকারি পরিসংখ্যানে আমদানি কমার অর্থ এই নয় যে সামগ্রিক বাজারের চাহিদা কমে গেছে। এই চাহিদার কিছু অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অন্য খাতে চলে যেতে পারে।
আগস্ট মাসে ভারতে রুপার আমদানি ১২৭% বৃদ্ধি পেয়ে ১.০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে সোনার দাম বাড়ার কারণে কিছু ক্রেতা রুপার দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসে রুপার আমদানি ৮.৮১ শতাংশ কমেছিল। সুতরাং, আগস্টের এই বৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক হবে না।
আগামী মাসগুলিতে ধনতেরাস, দিওয়ালি এবং বিয়ের মরসুম সোনার বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে। এর মাধ্যমেই বোঝা যাবে যে ভোক্তারা কেবল তাদের ক্রয়ের ধরণ পরিবর্তন করেছেন, নাকি সামগ্রিক চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এমন খবরও পাওয়া গেছে যে সরকার সোনা ও রুপার উপর আমদানি শুল্ক কমানোর কথা ভাবছে, কিন্তু এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যদি শুল্ক পরিবর্তন করা হয়,
এমনটা হলে, সোনার আমদানি ও বাজারদরের ওপর এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে দৃশ্যমান হতে পারে।
বর্তমান তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, ভারতীয়রা সোনা কেনা পুরোপুরি ছেড়ে দেননি। দামী সোনা অবশ্যই তাদের কেনার ধরণ বদলে দিয়েছে। ক্রেতারা ভারী গয়নার পরিবর্তে হালকা গয়না বেছে নিচ্ছেন, পুরোনো সোনা বদল করছেন এবং নিজেদের বাজেট অনুযায়ী কেনাকাটা করছেন। এর অর্থ ওজন কমানো, সোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। সোনার এই চড়া দামের যুগে ভারতীয় ক্রেতাদের গল্প এটাই।