
নিয়ম হোক বা ভবিষ্যতের সঞ্চয় কিংবা বিনিয়োগের সুযোগ—ভারতীয়দের কাছে বিপুল পরিমাণ সোনা গচ্ছিত রয়েছে। মার্চ ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী, এই সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টন। প্রকৃতপক্ষে, 'অর্থ ভারত ইনভেস্টমেন্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা শচীন সাউরিকরের মতে, দেশের ২৪ কোটি পরিবারের মধ্যে এই সোনা ভাগ করে দিলে দেখা যায়—গড়ে প্রতিটি পরিবারের কাছে প্রায় ১০০-১৫০ গ্রাম সোনা রয়েছে, যার বর্তমান বাজার মূল্য ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা।
উল্লেখ্য, গত মাসে প্রকাশিত 'কোটাক ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিস'-এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে যে, ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে গচ্ছিত সোনার মোট মূল্য এখন প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোনার দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই সম্পদের মূল্যও আকাশচুম্বী হয়েছে; বর্তমানে ভারতীয় পরিবারগুলোর মোট সম্পদের (স্থাবর সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট বাদে) মধ্যে সোনার অংশই প্রায় ৬৫ শতাংশ।
সোনার সম্পদের প্রতি আপনার আগ্রহ যদি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যবহারের উদ্দেশ্যে না হয়ে থাকে, তবে প্রথাগতভাবে সোনার গয়না, মুদ্রা বা বার কেনার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা সোনার অন্যান্য বিকল্প মাধ্যমগুলোও মনে করে দেখতে পারেন। এই বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড (MFs), সভরেন গোল্ড বন্ড (SGBs), ডিজিটাল গোল্ড এবং গোল্ড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড (ETFs)।
আজ জানবো—'ডিজিটাল গোল্ড' এবং 'গোল্ড ETF' আসলে কী এবং বিনিয়োগের এই দুটি মাধ্যমের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো কী কী।
'ক্লিয়ারট্যাক্স' (ClearTax)-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধারণাগতভাবে ডিজিটাল গোল্ড বা ডিজিটাল সোনা বা আসল সোনার চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়। মূল পার্থক্যটি হলো—আপনি ডিজিটাল সোনা অনলাইনে ক্রয় করতে পারেন এবং এই সোনার ইস্যুকারী বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানটি আপনার হয়ে সেই সোনা তাদের নিজস্ব ভল্ট বা সুরক্ষিত ভাণ্ডারে সংরক্ষণ করে রাখে।
উল্লেখ্য যে, ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক—রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) এবং শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া (SEBI)-এর এই বিশেষ বিনিয়োগ মাধ্যমের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণমূলক বা তদারকির ক্ষমতা নেই।
তবে এটি আয়কর সংক্রান্ত নিয়মাবলির আওতাভুক্ত। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডিজিটাল গোল্ড যদি ২৪ মাস বা তার বেশি সময় ধরে নিজের কাছে রাখা হয়, তবে তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফাকে 'দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী লাভ' (LTCG) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এর ওপর ১২.৫ শতাংশ হারে (প্রযোজ্য সেস বা উপকরসহ) কর ধার্য করা হয়।
অন্যদিকে, যদি ডিজিটাল গোল্ড ২৪ মাসের (বা দুই বছরের) কম সময় ধরে রাখা হয়, তবে তা থেকে প্রাপ্ত মুনাফাকে 'স্বল্পমেয়াদী মূলধনী লাভ' (STCG) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং আপনার আয়ের স্তর বা 'ইনকাম স্ল্যাব' অনুযায়ী নির্ধারিত হারে এর ওপর কর দিতে হয়। ডিজিটাল সোনা বিক্রির ক্ষেত্রে, এর ওপর ধার্য করের নিয়মাবলি সোনার গহনা(physical gold) এবং 'পেপার গোল্ড' বা কাগজ-ভিত্তিক সোনার (যার অন্তর্ভুক্ত হলো গোল্ড ইটিএফ, এসজিবি এবং গোল্ড মিউচুয়াল ফান্ড) মতোই হয়ে থাকে।
ClearTax-এর অপর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোল্ড ইটিএফ হলো একটি 'পণ্য-কেন্দ্রিক মিউচুয়াল ফান্ড' (commodity-focused MF), যা মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার ওপর বিনিয়োগ করে থাকে। বিনিয়োগকারীদের জন্য, এর প্রতিটি ইউনিট ১ গ্রাম সোনার সমান এবং স্টক এক্সচেঞ্জে এটি সাধারণ শেয়ার বা ইকুইটির মতোই কেনাবেচা করা যায়।
গোল্ড ইটিএফ-এর একটি প্রধান সুবিধা হলো, এটি বিনিয়োগকারীকে সোনা সংরক্ষণের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ঝামেলা ছাড়াই মূল্যবান এই ধাতুর মালিকানা প্রদান করে; পাশাপাশি এটি গহনা সোনার সমান মুনাফা এবং তারল্যের (liquidity) প্রয়োজনে শেয়ার কেনাবেচার মতো সুবিধাজনক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
উল্লেখ্য যে, গোল্ড ইটিএফ-এর ক্ষেত্রে ১২ মাসের অধিক সময়ের জন্য বিনিয়োগ ধরে রাখলে তা 'দীর্ঘমেয়াদী মূলধনী লাভ' বা LTCG-এর আওতাভুক্ত হয় এবং এর ওপর ১২.৫% হারে (ইনডেক্সেশন সুবিধা ছাড়া) কর ধার্য হয়; অন্যদিকে, ১২ মাসের কম সময়ের জন্য বিনিয়োগ ধরে রাখলে তা 'স্বল্পমেয়াদী মূলধনী লাভ' বা STCG-এর আওতাভুক্ত হয় এবং এর ওপর ২০% হারে কর দিতে হয়।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (Asset Management Company) গহনা সোনা ক্রয় করে এবং তা সুরক্ষিত ভল্ট বা সিন্দুকে সংরক্ষণ করে রাখে।
বিনিয়োগকারীরা এই ইটিএফ-এর ইউনিট ক্রয় করেন, যেখানে প্রতিটি ইউনিট ১ গ্রাম সোনার সমান হিসেবে গণ্য হয়।
ইটিএফ-এর 'নিট সম্পদ মূল্য' বা NAV (Net Asset Value) বাজারে সোনার দরের ওঠানামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে থাকে।
এর কার্যপদ্ধতি অনেকটা স্টক এক্সচেঞ্জের মতোই, যেখানে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী যেকোনও সময় ইটিএফ-এর ইউনিট ক্রয় বা বিক্রয় করতে পারেন।
এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া হলো: কোনও গোল্ড ইটিএফ-এ ৩০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে আপনি প্রতিটি ৫,০০০ টাকা দরে মোট ছয়টি ইউনিট ক্রয় করতে পারবেন। এর অর্থ হলো, আপনি বাজারে সোনার বর্তমান দরে ৫,০০০ টাকা মূল্যের ছয়টি গোল্ড ইটিএফ ইউনিটের মালিকানা লাভ করলেন; সোনার দাম বাড়লে বা কমলে এই ইউনিটগুলোর বাজারমূল্যও সেই অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে থাকবে। বিনিয়োগ প্রত্যাহারের বা বেরিয়ে আসার সময়, আপনি আপনার ইউনিটগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে সাধারণ শেয়ার বিক্রয়ের মতোই বিক্রি করে দিতে পারবেন।
আপনি সোনার সম্পদে বিনিয়োগের জন্য যে বিকল্পটিই বেছে নিন না কেন, বিনিয়োগের আগে নিচের প্রধান বিষয়গুলো অবশ্যই মনেয় রাখা উচিত:
গত কয়েক বছরে, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে সোনা গড়ে প্রায় ১০% হারে সর্বোচ্চ মুনাফা দিয়েছে; এর অর্থ হলো, সোনাকে একটি 'মধ্যমেয়াদী বিনিয়োগ' হিসেবে মনে করাই ভালো।
আপনি যে বিনিয়োগটিই করুন না কেন, তার নথিপত্রের খুঁটিনাটি (fine print) বা শর্তাবলি ভালোভাবে যাচাই করে নিন এবং চূড়ান্ত সম্মতি বা স্বাক্ষর করার আগে এর নিয়মাবলি সঠিকভাবে বুঝে নিন।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে, আপনার মোট বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে সোনার অংশ যেন কোনওভাবেই ১০%-এর বেশি না হয়; তাই বিনিয়োগের মাধ্যম নির্বাচনের সময়—আপনি কীভাবে সম্পদ বণ্টন করতে চান, বিনিয়োগের উদ্দেশ্য বা ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা কী এবং ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা (risk appetite) কতটুকু—সেই বিষয়গুলো অবশ্যই মনে রাখবেন।
স্বর্ণ বিনিয়োগের সঙ্গে সাধারণত আনুষঙ্গিক খরচ জড়িত থাকে—যেমন গয়না তৈরির মজুরি, সংরক্ষণের জন্য ব্যাঙ্ক লকার বা বীমা খরচ, এবং কাগজ বা ডিজিটাল স্বর্ণের ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ ফি ইত্যাদি। তাই বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে, আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলোর সাপেক্ষে এর সুবিধা ও অসুবিধাগুলো ভালোভাবে মনে করে নিন।
দ্রষ্টব্য: বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। এশিয়ানেট নিউজ বাংলা বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করে না। এই প্রতিবেদন কেবলমাত্র তথ্য প্রদানের জন্য দেওয়া। বাজারে বিনিয়োগ করতে হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন।