
নতুন গাড়ি বা বাইক কেনার সময় অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছ থেকেই মোটর ইনস্যুরেন্স করিয়ে নিতে হয়। ফলে একাধিক সংস্থার পলিসি ও প্রিমিয়ামের তুলনা করার সুযোগ সীমিত থাকে গ্রাহকের। এবার এই ব্যবস্থাতেই বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিল IRDAI। IRDAI-এর ‘Recalibrating Economics of Insurance Distribution’ শীর্ষক কনসালটেশন পেপারে মোটর ইনস্যুরেন্সের বিক্রি, কমিশন, ডিলারদের ভূমিকা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে এগুলি এখনও প্রস্তাব পর্যায়েই রয়েছে, চূড়ান্ত নিয়ম নয়।
IRDAI-এর তথ্য অনুযায়ী, মোটর ইনস্যুরেন্সে কমিশন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। গড় কমিশন প্রায় ২৪ শতাংশ। নতুন ও পুরনো গাড়ি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত OEM ব্রোকার এবং Motor Insurance Service Providers বা MISPs-এর ক্ষেত্রে গড় কমিশন প্রায় ২৪ শতাংশ, যা কোনও কোনও ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছয়।
FY25-এ এই চ্যানেলগুলির মাধ্যমে প্রায় ২৯,০০০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম সংগ্রহ হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭,০৫০ কোটি টাকা কমিশন হিসেবে দেওয়া হয়। IRDAI-এর প্রশ্ন, তুলনামূলক সহজ কিছু মোটর ইনস্যুরেন্স পণ্যের ক্ষেত্রে এত বেশি কমিশন দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে কি না।
প্রস্তাব কার্যকর হলে গ্রাহককে শুধুমাত্র গাড়ির ডিলারের মাধ্যমে ইনস্যুরেন্স কিনতে হবে না। নতুন ও পুরনো গাড়ির ইনস্যুরেন্স পলিসি Market Infrastructure Institution বা MII-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এই ক্ষেত্রে Bima Sugam-এর মতো প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এর ফলে গ্রাহক বিভিন্ন বিমা সংস্থার পলিসি সম্পর্কে তথ্য দেখে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ইনস্যুরেন্স বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই নট-ফর-প্রফিট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে পরিষেবার খরচ বাবদ প্রিমিয়ামের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
নতুন নিয়ম চালু হলে গাড়ির ডিলারদের গ্রাহককে বিকল্প ইনস্যুরেন্স কেনার সুযোগ সম্পর্কে জানাতে হতে পারে। এমনকি MII প্ল্যাটফর্মের অপশন এবং QR কোডও স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, নতুন গাড়ি বা বাইক কেনার সময় ডিলার যে ইনস্যুরেন্স পলিসি দিচ্ছেন, সেটিই নিতে হবে—এমন পরিস্থিতি থেকে গ্রাহককে বের করে আনাই এই প্রস্তাবের অন্যতম লক্ষ্য।
গাড়ির লোন দেওয়ার সময় ব্যাঙ্ক বা NBFC-এর মাধ্যমে ইনস্যুরেন্স বিক্রির বিষয়টিও IRDAI-এর নজরে রয়েছে। লোন ও ইনস্যুরেন্স একসঙ্গে বিক্রির ক্ষেত্রে প্রায় ১৬ শতাংশ কমিশনের নজির রয়েছে বলে কনসালটেশন পেপারে উল্লেখ করা হয়েছে। IRDAI চায়, লোন নেওয়ার সময় গ্রাহক যেন স্পষ্টভাবে জানতে পারেন—কোথা থেকে ইনস্যুরেন্স নেওয়া হচ্ছে, তার দাম কত এবং সেটি নেওয়া বাধ্যতামূলক কি না।
প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ক্যাশলেস রিপেয়ার। কোনও গ্রাহক যদি ডিলারের কাছ থেকে ইনস্যুরেন্স না কিনে অন্য কোনও সংস্থার পলিসি নেন, শুধুমাত্র সেই কারণে ডিলার ক্যাশলেস রিপেয়ারের সুবিধা অস্বীকার করতে পারবেন না। অর্থাৎ, পলিসিতে ক্যাশলেস রিপেয়ারের সুবিধা থাকলে শুধু ইনস্যুরেন্স অন্য জায়গা থেকে কেনা হয়েছে—এই যুক্তিতে সেই সুবিধা বন্ধ করা যাবে না।
পলিসি বিক্রির উপর ভিত্তি করে OEM এবং ইনস্যুরেন্স ডিস্ট্রিবিউশন সংস্থাগুলির মধ্যে অতিরিক্ত ইনসেন্টিভ বা সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে IRDAI। নিয়ন্ত্রকের মতে, এই ধরনের ইনসেন্টিভ ব্যবস্থা থাকলে গ্রাহকের সামনে থাকা ইনস্যুরেন্সের বিকল্প ও দামের প্রতিযোগিতা প্রভাবিত হতে পারে।
থার্ড-পার্টি ইনস্যুরেন্সে কম কমিশনের প্রস্তাব
মোটর ইনস্যুরেন্সের ক্ষেত্রে থার্ড-পার্টি কভার বাধ্যতামূলক। এই ধরনের অপেক্ষাকৃত সহজ পলিসির ক্ষেত্রে কম কমিশন রাখার প্রস্তাব দিয়েছে IRDAI। নতুন কমিশন কাঠামোয় পলিসির ধরন, কোন মাধ্যমে সেটি বিক্রি হচ্ছে এবং পলিসি বিক্রি ও পরিষেবা দিতে কতটা কাজ করতে হচ্ছে—এসব বিষয় বিবেচনা করা হতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এগুলি এখনও IRDAI-এর কনসালটেশন পেপারের প্রস্তাব। চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে এখনও কার্যকর হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছ থেকে মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়া ২৫ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। এরপর প্রাপ্ত মতামত ও আপত্তি বিবেচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে। অর্থাৎ, আপাতত গাড়ির ইনস্যুরেন্স কেনার বর্তমান ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। তবে প্রস্তাবগুলি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে গাড়ি কেনার সময় ইনস্যুরেন্স বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের হাতে আরও বেশি বিকল্প আসতে পারে এবং ডিলার-নির্ভরতা কমতে পারে।