
রবিবার সকালে প্রয়াত হলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জগতে তৈরি হল এক অপূরণীয় শূন্যতা। তবে একজন শিল্পীর জীবন কি কেবল তাঁর শারীরিক উপস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ? যোগেন চৌধুরীর ক্ষেত্রে উত্তরটা সহজ। তাঁর আঁকা ছবি, রেখার স্বতন্ত্র চলন এবং রঙের ব্যবহারের মধ্যে দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন আগামী প্রজন্মের কাছে।
অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে এক জমিদার পরিবারে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। শৈশবের সেই পরিবেশ তাঁর শিল্পীসত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই চারপাশের দৃশ্য, প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন এবং লোকশিল্পের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। মাত্র আট-নয় বছর বয়সে কলকাতায় চলে আসতে হয় তাঁকে। পরবর্তী জীবনে আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হলেও শিল্পের প্রতি টান কখনও হারিয়ে যায়নি। ছোটবেলায় বিভিন্ন পত্রিকা থেকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শাহজাহানের মৃত্যুশয্যায়’ কিংবা পাবলো পিকাসোর ‘শ্বেতকপোত’-এর মতো বিখ্যাত শিল্পকর্মের ছবি সংগ্রহ করতেন তিনি। সেই ছবিগুলি ছিল তাঁর কাছে শিল্পকে জানার অন্যতম মাধ্যম। পাশাপাশি নিজেও ছবি আঁকার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। স্কুলজীবনেই তাঁর শিল্পচর্চার পরিচয় মিলেছিল।
পরবর্তী সময়ে আর্ট কলেজে পড়াশোনা করেন যোগেন চৌধুরী। সেখান থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ফরাসি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ভর্তি হন। কিন্তু পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে মাঝপথেই তাঁকে শিক্ষকতার পেশায় যোগ দিতে হয়। শিল্পচর্চার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ অবশ্য সেখানেই থেমে থাকেনি। বিদেশে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পাওয়ার পর চাকরি ছেড়ে প্যারিসে পাড়ি দেন তিনি। জীবনের প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের শিল্পীসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন এই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। যোগেন চৌধুরীর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর রেখার স্বকীয়তা। প্রচলিত নিয়ম মেনে বিষয় নির্বাচন কিংবা নিখুঁত কাঠামোর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি। ছবি আঁকার সময় রেখা কোন দিকে এগোবে, তার পরিণতি কী হবে, তা সব সময় আগে থেকে স্থির করে রাখতেন না। বরং আঁকার প্রক্রিয়ার মধ্যেই খুঁজে নিতেন নতুন অভিব্যক্তি।
নিজের শিল্পভাবনা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ছবি আঁকতে বসে তাঁর হাত কোন দিকে যাবে, তা আগে থেকে জানা থাকে না। তাঁর রেখা যেন মাটির সংস্পর্শে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। এই স্বতঃস্ফূর্ততা ও নিজস্ব অনুভবই তাঁর শিল্পকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরে জড়িয়ে ছিল শৈশবের স্মৃতি। ফরিদপুরের গ্রামীণ জীবন, কুমোরদের হাতে মাটির মূর্তি গড়ার দৃশ্য, পিঁপড়ের চলাচল, গাছের পাতায় রঙিন পোকার বিন্যাস, গ্রামের মেলা, থিয়েটার ও যাত্রা—সব কিছুই তাঁর মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তী জীবনে সেই অভিজ্ঞতাগুলি নানা ভাবে ফিরে এসেছে তাঁর শিল্পকর্মে। এক সাক্ষাৎকারে যোগেন চৌধুরী বলেছিলেন, ফরিদপুরের স্মৃতি মাঝেমধ্যেই তাঁর মনে ফিরে আসে, যেন সেই ছবিগুলি এখনও জীবন্ত। তাঁর উপলব্ধি ছিল, শৈশবের সেই পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় না থাকলে শিল্পকে এত নিবিড়ভাবে দেখার অভ্যাস হয়তো গড়ে উঠত না।
এই স্মৃতির জগৎই তাঁর শিল্পের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক বাস্তবতা, মানুষের আবেগ এবং চারপাশের জগতের প্রতি তাঁর পর্যবেক্ষণ মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষা। তাঁর ছবিতে তাই শুধু দৃশ্যের প্রতিফলন নয়, ধরা পড়েছে অনুভূতির নানা স্তরও। একজন শিল্পীর কাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই—নিজের সময়, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে এমন ভাবে শিল্পে রূপ দেওয়া, যা ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। যোগেন চৌধুরী সেই জায়গাতেই অনন্য। তাঁর কাজ নতুন করে ভাবতে শেখাবে শিল্পীদের, প্রশ্ন তুলবে শিল্পরসিকদের মনে এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে ভবিষ্যতের সৃষ্টিশীল মানুষদের। শিল্পীর জীবন থেমে গেলেও তাঁর সৃষ্টির যাত্রা থামে না। যোগেন চৌধুরী আর নতুন করে ক্যানভাসে রেখা টানবেন না, কিন্তু তাঁর আঁকা ছবির মধ্যে থেকে যাবে এক দীর্ঘ শিল্পজীবনের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও অনুভব। সেই উত্তরাধিকারই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে।
Entertainment News ( বাংলা বিনোদনের খবর ): Read Entertainment News including movie reviews, Trailers, Celebrity gossips, TV shows and other Entertainment News in at Asianet News Bangla.