
মস্কোয় এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) অজিত ডোভাল সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনওরকম দ্বিচারিতা বা দু'নম্বরী নীতি চলতে পারে না। দায়িত্বশীল দেশগুলিকে জঙ্গি গোষ্ঠী এবং তাদের মদতদাতা দেশগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মস্কোয় প্রথম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরাম এবং নিরাপত্তা বিষয়ক উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের চতুর্দশ আন্তর্জাতিক বৈঠকে ভাষণ দেওয়ার সময় ডোভাল বলেন, সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য অন্যতম বড় বিপদ।
অজিত ডোভাল বলেন, "প্রত্যেক দেশেরই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব আছে। এই লড়াইয়ে দ্বিচারিতা করা যাবে না। দায়িত্বশীল দেশগুলোকে ঠিক করতে হবে, তারা কি সন্ত্রাসবাদীদের মদতদাতাদের সমর্থন করবে, নাকি তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেবে।"
জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ টেনে ডোভাল বলেন, ভারত বরাবরই রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের শিকার। তিনি মূলত ইসলামাবাদের মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করেন। NSA বলেন, "২০২৫ সালের এপ্রিলে বিশ্ব দেখেছে কীভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে ২৬ জন নিরীহ মানুষকে তাদের পরিবারের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ধর্ম দেখে আলাদা করে তাদের খুন করা হয়।" এই হামলার দায় স্বীকার করেছিল পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার (LeT) শাখা সংগঠন 'দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট' (TRF)। এই হামলায় বেছে বেছে ধর্ম দেখে ২৬ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।
ডোভাল জানান, ভারত এই হামলার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি বলেন, "এই হামলার পর রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) যে বিবৃতি দিয়েছিল, ভারত সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই সমর্থন করে। UNSC বলেছিল, এই হামলার ষড়যন্ত্রকারী, সংগঠক, অর্থ জোগানদাতা এবং মদতদাতাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটেই ভারত পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার অপরাধীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিয়েছিল।"
এই জঙ্গি হামলার পরেই ভারত ২০২৫ সালের ৭ মে 'অপারেশন সিঁদুর' শুরু করে। পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর (PoJK) জুড়ে জঙ্গি পরিকাঠামোকে নিশানা করা হয় এই অভিযানে। এই অপারেশনে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ এবং হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে যুক্ত নয়টি প্রধান জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। খতম করা হয় ১০০ জনেরও বেশি জঙ্গিকে।
এর জবাবে পাকিস্তান ড্রোন হামলা এবং সীমান্ত শহরগুলিতে গোলাবর্ষণ শুরু করে, যার ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চার দিনের একটি সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভারতও এর যোগ্য জবাব দেয় এবং পাল্টা হামলা চালায়। পাকিস্তানের রাডার সিস্টেম এবং সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যার ফলে পাকিস্তানি সেনার ব্যাপক ক্ষতি হয়।
পরে পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস (DGMO) ভারতের DGMO-কে ফোন করেন এবং ১০ মে একটি যুদ্ধবিরতিতে দুই দেশ সম্মত হয়। বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে ডোভাল বলেন, বিশ্ব বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ হল সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ।
তিনি উল্লেখ করেন যে একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে উদীয়মান দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং জনসংখ্যার সুবিধা বাড়াচ্ছে। ডোভাল বলেন, "আজ ক্ষমতা আর কিছু হাতে সীমাবদ্ধ নেই। উদীয়মান দেশগুলি দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে। একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে গ্লোবাল সাউথের সমস্ত দেশ সমান অংশগ্রহণ চায়। একটি সুরক্ষিত এবং স্থিতিশীল বিশ্ব নিশ্চিত করার এটাই একমাত্র উপায়।" মস্কোয় ২৬ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত এই নিরাপত্তা ফোরামটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একটি সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, এই ফোরামে ১৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।